চার বছর পর অভিশপ্ত জাহাজ থেকে মুক্তি

আপডেটঃ ১২:৩৭ অপরাহ্ণ | এপ্রিল ২৪, ২০২১

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : প্রায় চার বছর মিশরের উপকূলে জাহাজে আটকে থাকার পর অবশেষে মুক্তি পেয়েছেন সিরিয়ার নাগরিক মোহাম্মদ আইশা। বৃহস্পতিবার মুক্তি পাওয়ার পর নিজ দেশে ফিরেছেন তিনি।

মোহাম্মদ আইশা তার ‘অভিশপ্ত’ জাহাজ এম ভি আমান-এ যোগ দিয়েছিলেন ২০১৭ সালের ৫ই মে।এখন তার কেমন লাগছে? এ বিষয়ে মোহাম্মদ বলেন, ‘স্বস্তি। আনন্দ। আমার কেমন লাগছে? আমার মনে হচ্ছে আমি যেন কারাগার থেকে মুক্তি পেলাম। আমি অবশেষে আমার পরিবারের সাথে মিলিত হতে যাচ্ছি। আমি আবার তাদের দেখতে পাবো।’

এই ঘটনা দিয়ে শেষ হল দীর্ঘ এক পীড়াদায়ক অভিজ্ঞতা, যা তাকে মানসিক এবং শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত করেছে। তাকে এমন এক জীবন যাপন করতে বাধ্য করা হয়েছিল, যেখানে তিনি বিদ্যুৎ, স্যানিটেশন বা কোন সঙ্গী ছাড়াই প্রায় চার বছর কাটিয়েছেন।

ঘটনার শুরু ২০১৭ সালের জুলাই মাসে, যখন এম ভি আমানকে মিশরীয় বন্দর আদাবিয়াতে আটক করা হয়। মালবাহী এই জাহাজের নিরাপত্তা যন্ত্রপাতি এবং সার্টিফিকেটের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল, যে কারণে তাকে আটক করা হয়।

খুব সহজেই এই সমস্যার সমাধান করা যেত। কিন্তু লেবাননে জাহাজের ঠিকাদার জালানির দাম পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়, আর বাহরাইনে এম ভি আমানের মালিক ভুগছিলেন আর্থিক সমস্যায় ।

জাহাজের মিশরীয় ক্যাপ্টেন ইতোমধ্যেই জাহাজ ছেড়ে চলে যাওয়ার ফলে, স্থানীয় এক আদালত চিফ অফিসার মোহাম্মেদ আইশাকে এম ভি আমানের আইনগত অভিভাবক ঘোষণা করে।

সিরিয়ার টারটুস শহরে জন্ম নেয়া মোহাম্মদ জানান, তার কাছে আদালতের আদেশের মানে ব্যাখ্যা করা হয়নি। তিনি সেটা বুঝতে পারলেন কয়েক মাস পরে- যখন জাহাজের অন্যান্য নাবিকরা এক এক করে চলে যেতে শুরু করে।

চার বছর ধরে, জীবন – এবং মৃত্যু – মোহাম্মেদের সামনে দিয়ে পার হয়ে গেল। তিনি দেখলেন, কাছের সুয়েজ খাল দিয়ে বিভিন্ন জাহাজের আনাগোনা। সম্প্রতি বিশাল কনটেইনার জাহাজ এভার গিভেন সুয়েজ খালে আটকে গেলে যে সঙ্কট তৈরি হয়, তখন কত জাহাজ খালে প্রবেশের জন্য অপেক্ষা করছে, সেটা তিনি বসে বসে গুনতেন।

এমনকি তিনি তার নাবিক ভাইকেও দেখেছেন, একাধিকবার তার জাহাজে পাশ দিয়ে চলে যেতে। দু’ভাই টেলিফোনে কথা বলেন, কিন্তু তাদের দু’জনের জাহাজ অনেক দূরে থাকায় একে অপরের প্রতি হাতও নাড়াতে পারেননি।

দু’হাজার আঠারো সালের আগস্ট মাসে তিনি জানলেন তার মা মারা গেছেন, যিনি ছিলেন একজন শিক্ষক এবং তার কারণেই মোহাম্মেদ এত ভাল ইংরেজি জানেন। মোহাম্মেদের জীবনে সেটাই ছিল সবচেয়ে বেদনাদায়ক মুহূর্ত। তিনি বলেন, ‘আমি সিরিয়াসলি ভাবছিলাম নিজের জীবন শেষ করে দেব।’

এরপর, ২০১৯ সালের আগস্টের মধ্যে, মোহাম্মদ ছিলেন সম্পূর্ণ একা, যদিও মাঝে-মধ্যে একজন পাহারাদার থাকতো। তিনি যে জাহাজে আটকে ছিলেন তার কোন জালানি ছিল না, যার ফলে কোন বিদ্যুৎও ছিল না। আদালতের আদেশে তিনি জাহাজে থাকতে বাধ্য ছিলেন, তার কোন বেতন ছিল না। হতাশা এবং বিষণ্ণতা তাকে গ্রাস করছিল এবং তার স্বাস্থ্য ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছিল।

তিনি বলেন, রাতে জাহাজটি ছিল একটি কবরস্থানের মত। আপনি কিছু দেখতে পারছেন না। আপনি কিছু শুনতে পারছেন না। ‘মনে হচ্ছিল যেন আমি একটি কফিনের ভেতরে।

২০২০ সালের মার্চ মাসে এক ঝড়ে এম ভি আমানের নোঙ্গর ছিঁড়ে যায়। জাহাজটি পাঁচ মাইল ভেসে তীর থেকে কয়েক মিটার দূরে আটকে যায়।

সেই অভিজ্ঞতা ছিল ভয়ঙ্কর, কিন্তু মোহাম্মদ এর জন্য ছিল আশীর্বাদের মত। তিনি ঝড়কে আল্লাহর কাজ হিসেবে দেখলেন। এখন তিনি সাঁতার কেটে কয়েক দিন পরপর তীরে যেয়ে খাবার-দাবার কিনতে এবং তার মোবাইল ফোন চার্জ করতে পারছিলেন।

মালিকপক্ষ কী বলছে?

আমানের মালিক, টাইলস শিপিং এ্যান্ড ম্যারিন সার্ভিসেস বলেছে, তারা মোহাম্মদকে সাহায্য করতে চেয়েছে, কিন্তু তাদের হাত বাঁধা ছিল।

কোম্পানির একজন প্রতিনিধি বলেন, ‘আমি জাহাজের আইনগত অভিভাবক বদলানোর জন্য একজন বিচারককে বাধ্য করতে পারি না এবং আমি এই বিশ্বে একজনকে পেলাম না- আমি অনেক চেষ্টা করেছি – যে তার জায়গায় যাবে।’

তাদের মতে, আদালতের আদেশে সই করাই মোহাম্মদের উচিত হয়নি।

ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের প্রতিনিধি মোহামদ আরাশেডি, যিনি ডিসেম্বরে মোহাম্মদ আইশার কেস নিয়ে কাজ শুরু করেন, বলেন এই ঘটনা শিপিং ব্যবসায় জড়িত সকলের চোখ খুলে দেয়া উচিত। তিনি বলেন, ‘মোহাম্মদর ঘটনাকে ধরে একটি জরুরি আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন – যাতে জাহাজের নাবিকরা আর এভাবে নিগৃহীত না হয়। এই আলোচনায় জাহাজ মালিক, বন্দর এবং ম্যারিটাইম কর্তৃপক্ষ এবং যেসব দেশের পতাকা জাহাজগুলো বহন করে, তাদের অংশগ্রহণ করা উচিত।’

তিনি জানান, ‘এই নাটক এবং মোহাম্মেদের দুর্ভোগ এড়ানো যেত, যদি মালিক পক্ষ এবং জাহাজটির প্রতি যাদের দায়িত্ব আছে তারা তাদের দায়িত্ব পালন করে তার প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করতেন।’

সমুদ্রেই ফিরতে চান

মোহাম্মদ বলছেন, তিনি এমন এক পরিস্থিতিতে আটকে ছিলেন যেটা তার নিজের সৃষ্টি নয়। একদিকে মিশরীয় আইন অন্যদিকে জাহাজ মালিকের অবহেলা, দু’দিক থেকে তিনি কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন।মাসের পর মাস তার সাথে কোনরকম যোগাযোগ করা হয়নি। নিজেকে পরিত্যক্ত এবং বিচ্ছিন্ন মনে হচ্ছিল।

আপনার হয়তো মনে হতে পারে, এর পর তিনি আবার সমুদ্রে ফিরে যাবার কথা ভাবতেই পারবেন না। কিন্তু তিনি পুরোপুরি সংকল্পবদ্ধ। তিনি বলেন, তার কাজ তিনি ভাল করে জানেন এবং আবার তিনি সে কাজ শুরু করতে চান। তবে, সেটা হবে তার পরিবারের সাথে দেখা-শোনার পর।

তবে মোহাম্মেদের গল্প যতই বিস্ময়কর হোক না কেন, তার অভিজ্ঞতা নতুন কিছু না। বরং, সমুদ্রে জাহাজ নাবিকদের পরিত্যক্ত করার ঘটনা বেড়েই চলছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও এর হিসেব মতে, সারা বিশ্বে এই মুহূর্তে ২৫০টি কেস আছে যেখানে নাবিকদের পরিত্যাগ করা হয়েছে। এই হিসেবে, ২০২০ সালে এরকম ৮৫টি কেস যোগ হয়েছে, যেটা তার পূর্ববর্তী বছরের দ্বিগুণ।

একই সময়, ইরানী বন্দর আসালাইয়েহতে মালবাহী জাহাজ উলার ১৯জন নাবিক, যাদের বেশির ভাগ ভারতীয়, অনশন ধর্মঘট শুরু করেছে। মালিক পক্ষ ২০১৯ সালের জুলাই মাসে জাহাজটি পরিত্যাগ করে।

সম্প্রতি নাবিকদের একজন শিপিং জার্নাল লয়েডস লিস্টকে জানায়, জাহাজের ভেতরে অবস্থা খুবই সঙ্কটাপন্ন, সবাই বিষণ্ণতায় ভুগছে আর তাদের পরিবার টাকা-পয়সা যোগান দিতে পারছে না।

দুবাই-এ অবস্থিত মিশন টু সিফেয়ারার্স নামক সংগঠনের মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ এশিয়া পরিচালক এ্যান্ডি বওয়ারম্যান বলেন, তিনি এরকম ঘটনা বার বার ঘটতে দেখেছেন। এসব ঘটনার পেছনে একই রকম কারণ আছে বলে তাদের পর্যবেক্ষণ।

তিনি বলেন, ‘আমরা একটি কেস নিয়ে কাজ করছি, যেখানে কোম্পানির বিশাল অঙ্কের দেনা আছে, যেটা জাহাজের মর্টগেজের চেয়ে অনেক বেশি। অনেক সময়, নাবিকদের নোঙ্গর ফেলতে বলে রীতিমত মুখ ফিরিয়ে নেয়া মনে হয় অনেক সহজে।’ সূত্র: বিবিসি