নরসিংদীতে লকডাউনে থমকে গেছে পাইকারি কাপড়ের বাজার বাবুরহাট

আপডেটঃ ৮:৩৮ অপরাহ্ণ | এপ্রিল ১৯, ২০২১

 এম.এ.সালাম রানা, জেলা প্রতিনিধি,  নরসিংদী :লকডাউনে থমকে গেছে দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি   কাপড়ের বাজার প্রাচ্যের ম্যানচেষ্টার খ্যাত শেখেরচরবাবুরহাট।টানা সাতদিনের ঠোর লকডউনের ফলে সকল দোকান-পাট বন্ধ রয়েছে। সকল প্রকার যান চলাচল বন্ধ থাকায় দেশের বিভিন্ন    জেলা থেকে পাইকারি ক্রেতারা সতে পারছেনা হাটে। এছাড়া অনলাইনে বেচাকেনা চালু থাকলেও তেমন একটা সারা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ঈদ মৌসুমে ছোট ছোট দোকান মালিককর্মচারী  কাপড়ের গাইট টানার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা   মানবেতর জীবন যাপন করছে।

জানা যায়নরসিংদীর সদর উপজেলার শেখেরচর বাজারটি প্রাচ্যের ম্যানচেষ্টার খ্যাত বাবুরহাট নামে পরিচিত। স্থানীয় জমিদার হলধর সাহা ১৯৩৪ সালে নিজের প্রায় ১১ এক জমিতে বাজারটি প্রতিষ্ঠা করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই এটি দেশব্যাপী খ্যাতি অর্জন করে। এটি দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি কাপড়ের বাজার। এমন কোন কাপড় নেই যা এখানে পাওয়া যায় না। বাবুরহাটে ছোট মিলিয়ে প্রায়  হাজার বিভিন্ন ধরনের কাপড়ের দোকান বসে। এই বাজারের কাপড় দেশের মানুষের প্রায় ৭০ ভাগ দেশীয়কাপড়ের চাহিদা পূরণ করে। ৮৭ বছরের পুরনো পাইকারি এই কাপড়ের হাটে প্রতিদিন বেচাকেনা হয় কোটি কোটি টাকার কাপড়। বছরের অন্যান্য সময় প্রতি সপ্তাহে বেঁচাকেনা হয়  থেকে ৭শকোটি টাকা।বুধবার বিকেল থেকে জমতে শুরু করে বাবুরহাট। বৃহস্পতিবা  শুক্রবার পুরো দমে চলে হাট। শনিবার বিকেলে শেষ হয় হাটের সক বেচাকেনা। এসময়ে ক্রেতাবিক্রেতার উপস্থিতি  কুলিদের হাক ডাকে সরব থাকে পুরো হাট এলাকা। ঈদ মৌসুমে বিভিন্ন জেলার পাইকারী ক্রেতাবিক্রেতা মিলিয়ে / লাখ লোকের সমাগম ঘটে বাবুরহাটে এবং দুই থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকার কাপড় বেচাকেনা হয়।

বাবুরহাটে বিক্রি হওয়া থানকাপড়, পপলিন কাপড়, ভয়েল কাপড়, সুতি, শাড়ি, থ্রি-পিস নরসিংদী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার তাঁতশিল্পে উৎপন্ন। শুধু তাই নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় উৎপাদিত নাইট কুইন, দেশি জর্জেট, লেজার জর্জেট, জাপানি সিল্ক, টাঙ্গাইলের শাড়ি, জামদানি, কাতানসহ বিভিন্ন প্রকারের কাপড়ের সম্ভারে বাবুরহাট হয়ে উঠেছে বৈচিত্র্যময়।

বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার সরেজমিনে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে গড়ে উঠা নরসিংদীর শেখেরচর-বাবুরহাট ঘুরে দেখা গেছে, চলমান লকডাউনের ফলে নিরব-নিস্তব্ধ বাবুরহাট। নেই কোন শোরগোল। বন্ধ রয়েছে হাটের সকল দোকানপাট । প্রতিটির দোকানের সার্টারে ঝুলছে বড় বড় তালা। অনেক দোকানী হাটে আসলেও দোকান খুলতে দেখা যায়নি।

এসময় উপস্থিত অনেক দোকানদার বলেন, লকডাউনের কারণে বাস ও ট্রেনসহ পাবলিক পরিবহনগুলোর চলাচল বন্ধ থাকায় আশপাশের জেলাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে হাটে কোন পাইকারি ক্রেতা আসতে পারছেনা। এ অবস্থায় দোকান খুললেও তাদের কোন বেচাকেনা করতে পারবেনা।

আসাদুজ্জামান নামে এক ছাপা কাপড় ব্যবসায়ী বলেন, ‘ঘরে বসে থাকতে মন চাইছে না, তাই কাপড়গুলো ঠিকঠাক আছে কি তা দেখতে ঘুরতে ঘুরতে হাটে চলে এসেছি। বছরের এগারটি মাস লাভলোকসানের মধ্যদিয়ে আমরা ব্যবসা পরিচালনা করলেও অপেক্ষায় থাকি ঈদ মৌসুমের এই একটি মাসের জন্য। কিন্তু দেশের মহামারি করোনা পরিস্থিতির জন্য সরকার ঘোষিত লকডাউনে আমাদের সব আশা আকাঙ্খা ভেস্তে গেছে। বর্তমানে তাদের জীবন জীবিকাই কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বেশ কয়েকটি গলি ঘুরে আদূরি ফেব্রিক্স নামে একটি দোকান খোলা দেখা যায়, এগিয়ে গিয়ে কথা বলতেই জানা যায়, পুরাতন দোকান ছেড়ে তারা নতুন দোকানে মালামাল সরিয়ে আনছে। সেজন্যই দোকান খোলা রয়েছে। দোকান মালিক জানায়, তাদের নতুন দোকানে মালামাল সরিয়ে আনার জন্য তারা দোকান খোলা থাকলেও সকাল থেকে এ পর্যন্ত (বিকেল সাড়ে তিনটা নাগাদ) কোন পাইকারের চেহারা দেখেনি তারা। কেউ কিছু জিজ্ঞেসও করেনি।

বাবুরহাটে পন্য পরিবহনের কাজে নিয়োজিত থাকা কয়েকটি ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির সামনে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে উপর দাঁড়ানো কয়েকটি ট্রাকে মাল ভর্তি করতে দেখা যায়।

এসময় শিকদার ট্রাভেল্স এর মালিক মানুনের সাথে কথা বলে জানা যায়, অনলাইনে অর্ডারকৃত কাপড় তারা পরিবহন করছেন। চলতি ঈদ মৌসুমে অন্যান্য বছর এই সময়ে প্রতিদিন তারা ১০/১২ ট্রাক দেশে উত্তরাঞ্চলে পাঠাতো অথচ এ বছর লকডাউনে তা হচ্ছেনা। সারাদিনে এই একটি ট্রাক পাঠাচ্ছে তাও পুরো লোড করতে পারবেনা।

তিনি বলেন, চলমান এই লকডাউনে স্বল্প পরিসরে বাবুরহাট খুলে দিলে দোকান মালিক, কর্মচারী, শ্রমিক ও আমরা ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায়ীরা পরিবার পরিজন নিয়ে ঈদ উদযাপন করতে পারতাম।

শেখেরচর-বাবুরহাট বাজার বনিক সমিতি কার্যালয়ে গিয়ে সমিতি কোন কর্মকর্তার দেখা মেলেনি। শুধু মাত্র কয়েকজন পুলিশ সদস্য বসে আছেন। এসময় বেশ কয়েকজনকে ফোন করার পর সমিতির ক্রিড়া সম্পাদক মোখলেছুর রহমান সাংবাদিকদের অনুরোধে কার্যালয়ে আসেন।

তিনি বলেন, সরকারী নির্দেশনা মেনে শেখেরচর-বাবুরহাটে লকডাউন চলছে। গত সপ্তাহে লকডাউন এতোটা কঠোর না হওয়ায় দেশে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকারি ক্রেতারা বাজারে আসতে পেরেছিল তাই বাবুরহাটের দোকানপাট স্বল্প পরিসরে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫ পর্যন্ত খোলা রাখা হয়েছিল। কিন্তু এ চলতি কঠোর লকডাউনে সকল প্রকার যান চলাচল বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীরা হাটে আসতে পারছেনা। বাবুরহাটে অনলাইনে কাপড় বেচাকেনার প্রচলন শুরু হয়েছিল গত বছর থেকে। গত বছর করোনা পরিস্থিতি ফলে বাজার বন্ধ থাকা প্রাথমিক অবস্থা অনলাইনে আমরা অল্প-স্বল্প বেচাকেনা করতে পেরেছি। কিন্ত চলমান লকডাউনে অনলাইনে বেচাকেনার সুযোগ থাকলেও তেমন একটা সারা পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, গত হাটে অনেক ব্যবসায়ীই তাদের প্রয়োজনী পন্য এরই মধ্যে কিনে নিয়ে গেছেন।

তিনি জানান, বাবুরহাটে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩ হাজার বিভিন্ন ধরেনের কাপড়ের দোকান বসে। এই দোকানগুলোতে প্রায় ১৫ হাজার লোক কাজ করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। বাজার বন্ধের কারণে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি দোকানের ওইসকল কর্মচারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। প্রতি ঈদ মৌসুমে বাবুরহাটে দুই থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকার কাপড় বেচাকেনা হয়। কিন্তু এ বছর তা নেমে এসেছে মাত্র এক হাজার কোটিতে

 

 

সিএনএ নিউজ/জামান