যে পরিবারের কারও আঙ্গুলের ছাপ নেই!

আপডেটঃ ৪:৩২ অপরাহ্ণ | ডিসেম্বর ২২, ২০২০

সি এন এ নিউজ,ডেস্ক : ২০০৮ সালে বাংলাদেশে যখন জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্য আঙ্গুলের ছাপ নেয়া শুরু হয়, তখন থেকেই রাজশাহীর পুঠিয়ার অপু সরকার ও তার পরিবারের সমস্যার শুরু।

অপুর বাবা অমল সরকার যখন বারবার আঙ্গুলের ছাপ দিতে ব্যর্থ হন, তখন ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা কর্মীরা বুঝতে পারছিলেন না তারা ঠিক কী করবেন। পরে কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে এনআইডি কার্ডে লেখা হয় ‘আঙ্গুলের ছাপ নেই।’

শুধু অপু ও তার বাবা নয়; বিরল এক বংশগত সমস্যার কারণে এই পরিবারের ছয় সদস্যের আঙ্গুলে কোনো ছাপ নেই।

এরপর থেকে সমস্যা শুধু বেড়েছেই। ২০১৬ সালে যখন মোবাইল সিম কার্ডের জন্য আঙ্গুলের ছাপ দেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়, তখন নতুন করে বিপদের মুখে পড়েন অপু সরকার।

আমি সিম নিতে যাওয়ার পর যতবার আঙ্গুলের ছাপ দিতে যাই, ততবারই সফটওয়্যার হ্যাং হয়ে যায়, যখন তাদেরকে আমার সমস্যার কথা বললাম, তারা বলল যে স্যরি, আমরা তো আঙ্গুলের ছাপ ছাড়া সিম দিতে পারবো না।

এক যুগ আগেও এটি হয়তো তেমন কোনো সমস্যা হিসেবে গণ্য হতো না, কিন্তু গত কয়েক দশকে আঙ্গুলের ছাপের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে বহুগুণে। বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি যে বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়, সেটি হচ্ছে আঙ্গুলের ছাপ।

অপু সরকার বলেন, আমার দাদারও একই সমস্যা ছিল। কিন্তু আমার দাদা মনে হয় না এটাকে কখনও সমস্যা হিসেবে দেখেছেন।

সুইটজারল্যান্ডের একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক পিটার ইটিন এবং আরও কয়েকজন গবেষক এ বিষয়ে একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেন ২০১১ সালে। ওই গবেষণায় তারা এই বংশগত বা জেনেটিক সমস্যার জন্য দায়ী জেনেটিক মিউটেশনটি শনাক্ত করেন।

তাদের গবেষণার সময় পর্যন্ত সারা বিশ্বে চারটি পরিবার শনাক্ত হয়েছিল, যারা বংশগতভাবে এই সমস্যায় ভুগছেন। এর সবগুলোই ছিল এশিয়া মহাদেশের বাইরে।

অধ্যাপক ইটিন বলেন, আলাদাভাবে এই সমস্যা পাওয়ার ঘটনা খুবই বিরল। সারাবিশ্বে অল্প কয়েকটি পরিবারের কথাই আমরা এখনও পর্যন্ত জানতে পেরেছি।

২০০৭ সালে এক সুইস নারী আঙ্গুলের ছাপ দিতে না পারায় যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দরে বারবার সমস্যায় পড়ার পর অধ্যাপক ইটিনের শরণাপন্ন হন। সেটিই ছিল তার কাছে এ ধরনের প্রথম কোনো রোগী।

পরবর্তীতে গবেষক দলটি ওই নারীর পরিবারের ১৬ জনের ওপর গবেষণা চালিয়ে বংশগত সমস্যার কারণটি খুঁজে বের করেন।

গবেষকদলটি এই রোগের আরেকটি নাম দেন – ‘অভিবাসন বিলম্ব রোগ’ বা ‘ইমিগ্রেশন ডিলে ডিজিজ’। তবে এই বিড়ম্বনা এখন শুধু বিমানবন্দরেই সীমাবদ্ধ নেই।

অপু সরকার জানালেন যে তিনি, তার বাবা এবং তার ছোট ভাই – তিনজনই এখন তার মায়ের নামে তোলা সিম ব্যবহার করেন।

মোবাইল ফোনের সিম ছাড়াও ২০১০ সাল থেকেই পাসপোর্ট ইস্যুর জন্য আঙ্গুলের ছাপ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই নিয়ম রয়েছে ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রেও।

কয়েক মাস চেষ্টা করার পর সিভিল সার্জনের করে দেয়া মেডিকেল বোর্ডের সার্টিফিকেট জমা দিয়ে শেষ পর্যন্ত পাসপোর্ট হাতে পান অমল সরকার। তবে বিদেশের বিমানবন্দরে গিয়ে আবার কী ঝামেলায় পড়তে হয়, সেই ভয়ে এখনও বিদেশে ভ্রমণ করার সাহস পাননি তিনি।

বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই এখন বিমানবন্দরে ভ্রমণকারীদের আঙ্গুলের ছাপ সংগ্রহ করা হয়।

পেশায় কৃষক অমল সরকার চলাফেরার জন্য একটি মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন। তবে তার কাছে ড্রাইভিং লাইসেন্সের কার্ডটি নেই।

তিনি বলেন, আমি রেজিস্ট্রেশন ফি জমা দিয়েছি। কিন্তু আঙ্গুলের ছাপ না থাকায় আমাকে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়নি।

এখন মোটরসাইকেল চালানোর সময় তিনি বিআরটিএ-তে জমা দেয়া ফি-এর রিসিটটি বহন করেন। এরপরও তাকে দু’বার জরিমানা দিতে হয়েছে।

অমল সরকারের বাবা এবং দাদারও একই সমস্যা ছিল। তারা দু’জনই ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। তার দুই ভাইও একই সমস্যা নিয়ে জন্মেছেন।

বড় ভাই গোপেশ সরকার প্রায় দুই বছর অপেক্ষা করার পর সম্প্রতি তার পাসপোর্ট হাতে পেয়েছেন।

দিনাজপুরের একটি হাসপাতালে চাকরি করেন গোপেশ সরকার। তিনি বলেন, এই পাসপোর্টের জন্য আমাকে চার থেকে পাঁচ বার ঢাকা যেতে হয়েছে, এটা বোঝানোর জন্য যে আসলেই আমার এই সমস্যা আছে।

তার হাসপাতালে যখন কর্মচারীদের হাজিরার জন্য আঙ্গুলের ছাপ নেয়া শুরু হয়, তখন তিনি কর্মকর্তাদের বুঝিয়ে পুরনো পদ্ধতিতে খাতায় স্বাক্ষর রাখতে রাজি করান।

মেডিকেল বোর্ড তাদের এই সমস্যাকে ‘কনজেনিয়াল পালমোপ্লান্টার কেরাটোডার্মা’ হিসেবে চিহ্নিত করেন।

অধ্যাপক ইটিন মনে করছেন, সরকার পরিবারের বংশগত কেরাটোডার্মাই সেকেন্ডারি অ্যাডারমাটোগ্লিফিয়ায় রুপ নিচ্ছে। সেকেন্ডারি অ্যাডারমাটোগ্লিফিয়া তুলনামূলকভাবে বেশিসংখ্যক মানুষের থাকতে পারে। কখনও কখনও আঙ্গুলের মাথায় হালকা রেখাও থাকে কারো কারো।

অ্যাডারমাটোগ্লিফিয়ায় আক্রান্তরা ‘হাত ও পায়ের তালুর চামড়ায় শুষ্কতার সমস্যা এবং কম ঘাম অনুভব করার কথাও বলেন।

অপু সরকারের পরিবারও একই ধরনের সমস্যার কথা উল্লেখ করে।

অপুর ভাষায়-আমি যে কী করবো, সেটাই বুঝতে পারি না। বারবার এই বিষয়টা বোঝাতেও ভালো লাগে না। অনেককে জিজ্ঞেস করেছি যে আমি কী করতে পারি, কিন্তু কেউ কোনো উত্তর দিতে পারে না। একজন বলছিলো যে আদালতে গিয়ে একটা আদেশ নিতে পারলে হয়তো সব জায়গায় সুবিধা হবে। যদি কখনও সম্ভব হয়, তাহলে সেটাই হয়তো করতে হবে।

তিনি নিজে এখনও ড্রাইভিং লাইসেন্স ও পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেননি।

সম্প্রতি মেডিকেল সার্টিফিকেট দেখিয়ে স্মার্টকার্ড করেছেন অপু সরকার ও তার বাবা। আঙ্গুলের ছাপ দিতে পারেননি, তবে রেটিনা স্ক্যান করা হয়েছে তাদের।

নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র বিভাগ থেকে বলা হচ্ছে, স্মার্টকার্ডের তথ্য থেকে রেটিনা স্ক্যান বা ফেসিয়াল রিকগনিশনের মাধ্যমেও ভবিষ্যতে সিম কার্ড বা ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যুর ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই করা সম্ভব হতে পারে।

তবে এসব ক্ষেত্রে যারা আঙ্গুলের ছাপ দিতে অক্ষম, তাদের জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থা করা হবে কি-না, এ বিষয়ে জানা যায়নি।

অমল এবং গোপেশ সরকার ছোটবেলা থেকেই যেহেতু জানেন যে আঙ্গুলের ছাপের এ সমস্যা তাদের বংশগত, তাই তারা কখনো চিকিৎসার চেষ্টা করেননি। তবে হাতের তালুর চামড়ার খসখসে ভাব কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শে কিছুদিন একটি ক্রিম ব্যবহার করেছিলেন অমল সরকার।

শুধুমাত্র জিন থেরাপির মাধ্যমেই ভবিষ্যতে এটি নিরাময় সম্ভব হতে পারে বলে মনে করছেন অধ্যাপক ইটিন।

অমল সরকার বলছেন, কৃষিকাজ করলে তার হাতের চামড়া খুব সহজেই ফেটে যায় ও সেটি তুলনামূলক খসখসে – এ নিয়ে তিনি এমনিতেই অস্বস্তিতে ভোগেন। তার ওপর এই সমস্যার কারণে পদে পদে অপদস্থ হতে হচ্ছে।

তার কথায় কারও সাথে হাত মিলাইতে গেলে সে একটু চমকে ওঠে। এইটা নিয়ে একটু লজ্জা লাগে আমার। বিবিসির সৌজন্যে