খাঁচায় বন্দি হতে চাই না : প্রিয়তি

আপডেটঃ ১১:৩০ অপরাহ্ণ | অক্টোবর ২৩, ২০১৫

বিনোদন প্রতিবেদক : দোহারা গড়ন। ছিপছিপে কটি। মুখে তার স্মিত হাসি। চোখে মুখে লেগে আছে বাঙ্গালি নারীর ষোলআনা মায়া। বলছি, মাকসুদা আক্তার প্রিয়তির কথা।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় তার জন্ম। শৈশব কেটেছে ঢাকাতেই। কৈশোরে তিনি পাড়ি জমান আয়ারল্যান্ডে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশি বংশ্দ্ভুদ এ মেয়েটি মিজ আয়ারল্যান্ড ২০১৪ প্রতিযোগিতায় বিজয়ীর মুকুটও মাথায় তুলেছেন।
মেধা আর পরিশ্রমের মাধ্যমে সদ্য শেষ হওয়া মিজ আর্থ ২০১৬ প্রতিযোগিতায় ৩টি বিভাগে বিজয়ী হয়েছেন প্রিয়তি। এ প্রতিযোগিতায় আয়ারল্যান্ডের প্রতিনিধিত্ব করলেও আভ্যন্তরীভাবে বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করেছেন তিনি।
ছোটবেলা থেকে মডেলিংয়ের সঙ্গে তার আত্মিক সর্ম্পক থাকলেও আইরিশ সিনেমা ওয়ান্ডারল্যান্ডের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে পা রাখেন এ অভিনেত্রী। বর্তমানে আয়ারল্যান্ডে বসবাস করছেন তিনি। তার নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে সম্প্রতি রাইজিংবিডির বিনোদন বিভাগকে সাক্ষাৎকার দেন প্রিয়তি। রাইজিংবিডির পাঠকদের জন্য এ সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো-


 : মডেলিংয়ের সঙ্গে কিভাবে সম্পৃক্ত হলেন?
প্রিয়তি : আমার বয়স তখন ১১/১২ বছর। তখন আমি বাংলাদেশেই থাকতাম। সে সময় একটি বিস্কুট কোম্পানির বিজ্ঞাপনে মডেল হিসেবে কাজ করি। সেটি ছিল আমার মডেলিংয়ের প্রথম কাজ। মূলত সেই সময় থেকেই আমার মডেলিংয়ে ক্যারিয়ার শুরু। যদিও ছোটবেলা থেকেই মডেলিং আমার ভালোবাসার জায়গা দখল করে নেয়। কিন্তু পড়াশোনার জন্য পুরোপুরিভাবে মডেলিংয়ের কাজে সময় দিতে পারতাম না। তারপরও অল্প অল্প সময় বের করে কাজ করতাম। এরপর আয়াল্যান্ডে এসে প্রথমে আমি র‌্যাম্পে কাজ করি। এভাবেই মডেলিংয়ে জড়িয়ে যাই।

 
: মিজ আয়াল্যান্ড প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণের গল্পটা শুনতে চাই।
প্রিয়তি : গল্পটা ২০১৩ সালের। তখন আমি আয়ারল্যান্ডের পরিবেশের সঙ্গে এতটাই মিশে গেছি যে, আমার জীবনটা একটা ছকে বাঁধা পড়ে যায়। আমার চাকুরি, বাচ্চাদের দেখাশুনা, বাসার কাজকর্ম ইত্যাদি ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। ছকে বাঁধা এমন জীবন নিয়ে অনেকটা হাফিয়ে উঠি। জীবনের ছন্দ হারিয়ে ফেলি। তখন আমি ভাবি, এমন কিছু করব যা আমি মন থেকে ভালোবাসি। আর আমার সবচেয়ে পছন্দের কাজ ছিল মডেলিং। এটাকে আমার একমাত্র সখও বলেত পারেন।
এর মধ্যে হঠাৎ একদিন খবরের কাগজে মিজ আয়রল্যান্ড প্রতিযোগিতায় রেজিস্ট্রেশনের খবর দেখি। তখন চিন্তা করি রেজিস্ট্রেশন করেই দেখি না কি হয়! তারপরই রেজিস্ট্রেশনের সমস্ত শর্ত পূরণ করে সব পাঠিয়ে দেই। ছবি ও কাগজপত্র পাঠানোর এক সপ্তাহের মধ্যে ওখান থেকে আমাকে জানানো হয়, প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হয়েছি আমি। কোনো কাজ শুরু করলে সেটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি স্থির থাকতে পারি না। সেই মতো আমি যেকোনো কাজ ৯৯ ভাগ নিখুঁত করার চেষ্টা করি। এ জন্য যা কিছু করা প্রয়োজন সব করি।


তারপর ২০১৩ সালের জুনে শুরু হয় এ প্রতিযোগিতা। এ জন্য নিজের শরীরকে তৈরী করা থেকে শুরু করে সমস্ত বিষয়ে প্রস্তুতি নিই। সে সময় মিশন ছিল কোনো কিছুর কমতি যেন আমার মধ্যে না থাকে। তারপর ২০১৪ সালের ১১ জানুয়ারি ৭ শত প্রতিযোগিকে পেছন ফেলে আমি বিজয়ী হই।
তবে বেশ কিছু বিষয় এ ক্ষেত্রে আমাকে সাফার করতে হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো- সমস্ত খরচ আমাকেই বহন করতে হয়েছে। আমার ড্রেসআপ থেকে শুরু করে সব কিছু নিজ খরচে করতে হয়েছে। এখনো আমি যুদ্ধের মাঠে একাই যুদ্ধ করে যাচ্ছি। এত কিছুর পরও পূর্ণ তৃপ্তি পাই যখন কোনো কিছু অর্জন করি।

: মিজ আর্থ ২০১৬ প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণের জন্য নিজেক কিভাবে প্রস্তুত করেছিলেন?
প্রিয়তি : মিজ আয়ারল্যান্ডের বিজয়ী হিসেবে আমি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ স্বাভাবিক নিয়মেই পেয়ে থাকি। সে অনুযায়ী মিজ আর্থের আয়োজক কর্তৃপক্ষ আমার সব কিছু যাচাই বাছাই করে এ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। যেহেতেু এটা একটা আন্তর্জাতিক সুন্দরী প্রতিযোগিতা সেহেতু আমি জানি, এখানে যেনতেনভাবে গেলে হবে না। এখানে নানা ধরণের কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে হবে। এ জন্য আমি চ্যারিটি শো করেছি, নানা ধরনের সামাজিক কর্মকাণ্ড করেছি, শারীরিকভাবে আগে থেকেই ফিট ছিলাম তবুও নিজেকে ঠিকঠাক মতো উপস্থাপন করতে জিরো ফিগার বানিয়েছি। এ প্রতিযোগিতায় আমি আয়াল্যান্ডের প্রতিনিধিত্ব করেছি কিন্তু আমি আইরিশ নই। স্বাভাবিকভাবেই ওরা বুঝতে পারতো আমি ইন্ডিয়ান কিংবা বাংলাদেশি। সেজন্য নানা ধরনের অ্যাসাইনমেন্ট আমাকে করতে হয়েছে। সব মিলিয়ে মানসিক চাপটাও বেশি ছিল।


 : মিজ আর্থ ২০১৬ প্রতিযোগিতায় ৩টি ক্যাটাগরিতে বিজয়ী হয়েছেন। আপনি কী প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রাপ্তিটা পেয়েছেন?
প্রিয়তি : সত্যিকার অর্থে প্রাপ্তির বিষয় যদি বলি- তবে আমি অনেক কিছুই পেয়েছি। কারণ সম্পূর্ণ জার্নি থেকে অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। যা থেকে অনেক কিছু শিখেছি। আমার জন্য এটা নতুন একটা জায়গা ছিল। এখানে অনেক নতুন মানুষকে পেয়েছি। এ মানুষগুলো আমাকে অনেক আপন করে নিয়েছিল। তাদের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছি সেটাও অনেক বড় পাওয়া।

 
:  মিজ আর্থ ২০১৬ প্রতিযোগিতার আয়োজকদের বিরুদ্ধে আপনার অভিযোগের কথা শুনেছি। এ বিষয়টি জানতে চাই।
প্রিয়তি : এ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহনের জন্য রিসোর্টে পা দেয়ার পর থেকে, যে কজন মানুষের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে, যারা আমাকে দেখেছেন প্রতিটি মানুষ বলেছেন- আমি উইনার হবো। তারা বলেছে- আমার মধ্যে সেই বেইজ, সেই ব্যক্তিত্বটা রয়েছে। এমনকি আমার কম্পিটিটর পর্যন্ত একই কথা বলেছেন। আমি যতবার স্টেজে উঠেছি প্রত্যেকবার বিচারকরা ‘ওয়াও’ বলে হাততালি দিয়ে আমাকে স্বাগত জানিয়েছেন। সবাই উল্লাসিত হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল আমি ফার্স্ট রানারআপও হয়নি।

 

আমার মনে হয়েছে- এতে আয়োজকদের এক ধরনের পক্ষপাতিত্ব ছিল। আমি বিচারকদের দোষ দিব না। কারণ আমি খুব ভালো করে জানি, ওরা আমার পারফর্মেমেন্স খুব হ্যাপি। যে বিজয়ী হয়েছে সে অনেক ভালো। সেও আমেরিকান একজন আর্মি অফিসার। কিন্তু তাকে তো দেখাতে হবে- সে এইদিক দিয়ে আমার চেয়ে ভালো!


 : কিয়ারন ডেভিস পরিচালিত আপনার অভিনীত প্রথম সিনেমা ‘ওয়ান্ডারল্যান্ড’। এ ছবি নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কেমন?

প্রিয়তি : এটা আমার প্রথম সিনেমা। তাই সিনেমাটির মুক্তি নিয়ে একটু বেশি অ্যাকসাইটেড। ছবিটি এ বছর মুক্তি দেয়ার কথা ছিল কিন্তু আভ্যন্তরীণ কিছু প্রক্রিয়ার কারণে সিনেমাটি আগামী বছর এপ্রিলে মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে। তাছাড়া পরিচালক কিয়ারন ডেভিস সিনেমাটিতে সাব টাইটেল ব্যবহার করে কয়েকটি দেশে একসঙ্গে মুক্তি দেয়ার পরিকল্পনা করেছে। সে অনুযায়ী ওরা কাজও করছে।

 
 :  একই পরিচালকের আরেকটি নতুন ছবিতে অভিনয় করতে যাচ্ছেন। এতে আপনার চরিত্রটি কেমন?

প্রিয়তি : আইরিশের সুপার হিরো কোকোলেন এর জীবনী নিয়ে নির্মিত হবে ছবিটি। এ সিনেমায় আমার চরিত্র হলো যুদ্ধারাণীর। এটি একটি নেতিবাচক চরিত্র। গল্পে এ চরিত্রটি অনেক গুরত্বপূর্ণ। এ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে আমি খুব খুশি।

 
: এ ছবির জন্য নিজেকে কিভাবে প্রস্তুত করছেন, শুটিং কবে নাগাদ শুরু হবে?

প্রিয়তি : যোদ্ধারাণীর চরিত্রে অভিনয়ের জন্য আমাকে বাড়তি প্রস্তুতি নিতে হবে। এ জন্য যুক্তরাজ্যে ৩ সপ্তাহের ট্রেইনিং করবো। আমাকে আরো ফিট হতে হবে। আগামী মাসেই এর প্রস্তুতির জন্য যুক্তরাজ্যে যাচ্ছি। চলতি বছরের ডিসেম্বর সিনেমাটির শুটিং শুরু হবে। ছবিটি বড় বাজেটের। আগামী বছর জুড়েই এ সিনেমার শুটিং অনুষ্ঠিত হবে। কারণ এর গল্পের সঙ্গে আবহাওয়ার বিষয়টিও জড়িত।


: এর মধ্যে আপনি বলিউড ও হলিউডের দুটি সিনেমার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন। ব্যাটে-বলে মিলে গেলে বলিউডে কী অভিনয় করবেন?

প্রিয়তি : ঠিকই বলেছেন। এর মধ্যে আমি দুটি সিনেমার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছি। মিজ আর্থ প্রতিযোগীতায় অংশ নেওয়ার জন্য হলিউডের সিনেমায়ে অভিনয় করিনি। কারণ ওই সিনেমার শুটিংয়ের তারিখ আর মিজ আর্থ প্রতিযোগিতার সময়টা একই ছিল। এ দুটো থেকে মিজ আর্থকে বেছে নিয়েছি। আর আমি আগেই বলেছি, ‘আমি যা করব সেটা নিখুঁতভাবে করতে চাই।’ বলিউডের সিনেমাটা অন্য কারণে করিনি। পরবর্তীতে ভালো প্রস্তাব পেলে বলিউডেও অভিনয় করবো। তবে আমি সি ক্লাসের কোনো চরিত্র বা সিনেমায় অভিনয় করবো না। যদি কাজ করি তবে গুরত্বপূর্ণ কাজ-ই করবো। না হয় কোনো কাজ করবো না। আমার ব্যক্ত্বিত্বের সঙ্গে যায় না এমন কোনো কাজ আমি করতে চাই না। কারণ আমার কাজের এত খিদে নেই।

: বাংলাদেশের সিনেমায় অভিনয় করার কোনো পরিকল্পনা কী আপনার আছে?
প্রিয়তি : বাংলা সিনেমায় অভিনয়ের জন্য অনেক প্রস্তাব এসেছে। কিন্তু মনের মতো কোনো সিনেমার কাহিনি পাইনি। সব মিলিয়ে আমার সঙ্গে যাবে এমন সিনেমার প্রস্তাব পেলে অবশ্যই আমি বাংলাদেশের সিনেমায় কাজ করব।

 
 : অভিনেত্রী হিসেবে আপনি কোথায় নিয়মিত হতে চান?
প্রিয়তি : আমি কোনো খাঁচায় বন্দি হতে চাই না। আমি মুক্ত থাকতে চাই। আমার চাহিদা অনুযায়ী যেখানে যখন কাজ করার সুযোগ পাব, সেখানেই কাজ করবো।

 
:  পেশাগতভাবে আপনি একজন বৈমানিক। অথচ অভিনয়, মডেলিংসহ মিজ আর্থের মতো প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে সফলতার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছেন। এতগুলো কাজ একসঙ্গে কিভাবে করছেন?
প্রিয়তি : আমার কাছে মনে হয়- আমাদের জীবনটা অনেক ছোট। এই জীবনের ঠিক যতটুকু ব্যবহার করতে পারি। একটা সময় আমাদের কাজের শক্তি থাকবে না, এই শরীর ঠিক থাকবে না। বয়স হবে। ঘরে বসে থাকতে হবে। এ জন্য যতটুকু পারছি নিজেকে ও সময়কে ব্যবহার করছি।

 

আমার দুটি বাচ্চা আছে- ওদেরকে আমার দেখাশোনা করতে হয়। পেশায় আমি একজন ফ্লাইট ইন্সট্রাক্টর। সেখানে সময় দিতে হয়। মডেলিং আমার সবচেয়ে ভালো লাগার জায়গা, সেখানেও সময় দিতে হয়। এই প্রত্যেকটা কাজ যেহেতু আমাকে করতে হয় তাই সময়ের সঙ্গে সব কাজ ভাগ করে নিয়েছি। এ জন্য অনেকগুলো কাজ একসঙ্গে নেই না। যে কাজে নিজেকে প্রতিনিয়ত ভাঙ্গা যায়, নিজেকে তৈরি করা যায় এ ধরনের কাজ আমি হাতে নিই। এতে আমি মানসিকভাবে তৃপ্তি পাই।


: আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাই।
প্রিয়তি : জনকল্যাণমূলক কাজ আমার ভালো লাগার জায়গা। আমি চাই মানুষের জন্য কিছু একটা করতে। বাংলাদেশে আসলে- কিছু মানুষের সঙ্গে কাজ করবো। ওদেরকে ইনকারেজ করবো। তা ছাড়া বাংলাদেশে যেসব শিশু শ্রমিক রয়েছে, যারা পড়াশোনা করতে পারে না। সিঙ্গেল মাদার রয়েছে- এদেরকে সাপোর্ট দেয়ার পরিকল্পনা আছে। সময়ের সঙ্গে এসব কাজ আরো বাড়াবো।
এ জন্য নিজের শক্ত একটা জায়গা প্রয়োজন। তাই ক্যারিয়ারটাকে শক্তভাবে দাঁড় করাতে চাই। শক্তভাবে দাঁড়াতে না পারলে মানুষ হয়তো আমাকে অবিশ্বাসও করতে পারে। এ জন্য আমার অবস্থান তৈরি করছি।