ব্রেকিং নিউজঃ

সন্ত্রাসী খাতার নাম মুছে শিক্ষকতায় আসার গল্প

আপডেটঃ ২:৩৭ অপরাহ্ণ | অক্টোবর ২৬, ২০১৫

ডেস্ক:
ভারতের মুম্বাইতে ২০০৬ সালে ট্রেনে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ১৮৯ জনের প্রাণহানী ঘটানোর অভিযোগে গত মাসে ১২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেয় আদালত। ওই মামলায় খালাস দেওয়া হয় দক্ষিণ মুম্বাইয়ের স্কুল শিক্ষক আব্দুল অহিদ শেখ’কে। সম্প্রতি তার সাথে কথা বলেছেন প্রতিবেদক মেনাকা রাও। অহিদের জীবন নিয়ে মেনাকার করা প্রতিবেদনটি বৃহস্পতিবার প্রকাশ করেছে বিবিসি।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, খালাস পাওয়ার একমাস পর ৩৭ বছর বয়সী বিজ্ঞানের ওই স্কুল শিক্ষক ফিরে গেছেন তার পুরোনো সেই স্কুল গ্রান্ট রোডের আবদুস সাত্তার সোয়েবে এ।

ওই স্কুলটির পরিচালনার দায়িত্বে আছে আঞ্জুমান-আই-ইসলাম ট্রাস্ট। অহিদের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে সংগঠনটির সভাপতি ড. জাহির কাজি বলেন, আমরা আমাদের আইনী সহায়কদের মতামত নিয়েই তাকে পুনরায় চাকরিতে নিযুক্ত করেছি। স্কুলের ফান্ডিংটা যেহেতু রাজ্য সরকারের সেহেতু তার বেতনের কাগজপত্রগুলোর অনুমোদন তাদেরকেই দিতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা কুসংস্কারে বিশ্বাস করি না। যে এক সময় খারাপ কাজ করেছে কিন্তু এখন সে পথ থেকে ফিরে এসেছে এবং নিজের পরিবার নিয়ে বাঁচতে চায় তাকে আমরা সাদরে গ্রহণ করেছি।’

নিজেকে উপযুক্ত শিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা

বিবিসির প্রতিবেদকের সাথে কথা বলার সময় হাসতে হাসতে অহিদ বলছিলেন, আমার এক সহকর্মী আমার সাথে কৌতুক করে বলেছিলেন, আপনি জেলেই ভালো ছিলেন। এগুলো সব শয়তানের বাচ্চা। আমরা প্রচণ্ড বিরক্ত। ওরা আপনার মাথার উঠে আপনাকে নির্যাতন করবে।’

তিনি বলছিলেন, স্কুলে ফেরার পর সবাই তাকে সাদরে গ্রহণ করেছেন এবং তিনি কোনো রকম খারাপ কথা শোনেননি যেমনটি জেল ফেরত ব্যক্তিদের সচরাচর শুনতে হয়।

তিনি বলেন, ‘আমার শিক্ষার্থীরা খুব আনন্দিত। কারণ, তাদের শিক্ষকের ছবি নামকরা ইংরেজি এবং উর্দু পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। সুতরাং আমার সম্পর্কে তাদের মাঝে কোনো খারাপ ধারনা নেই, যেরকমটি নেই তাদের অভিভাবকদের মনে। মুক্তির পর তারা কেউই আমাকে সন্ত্রাসী বলে ডাকে নি।

তিনি এখন নিজেকে একজন উপযুক্ত শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের কাছে তুলে ধরার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান ওই প্রতিবেদককে।

বদলে যাওয়া মুম্বাই

জেল থেকে ফেরার পর প্রথম দিন কিছু সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন অহিদ। প্রথম দিন ক্লাসে যাওয়ার পর বেশিরভাগ শিক্ষার্থীকেই দেখলেন তন্দ্রাচ্ছন্ন, এরমধ্যে তিনজন আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলো।

এ ঘটনায় চমকে গিয়ে আমি যখন শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞাসা করলাম কি হয়েছে? তখন তারা বললো রাত ১২টা থেকে ১ টা পর্যন্ত কম্পিউটার কিংবা মোবাইলে গেমস খেলে তারা। অনেকে নাকি আবার জেগেছে রাত ৪টা পর্যন্ত। এতরাতে ঘুমিয়ে এবং সকাল সাতটায় উঠে কিভাবে তারা চোখ খোলা রাখতে পারে এমন পাল্টা প্রশ্নও করে অনেক ছাত্র- বলছিলেন অহিদ।

তখনই অহিদ বুঝতে পারলেন পরিবর্তনটা শুধুমাত্র কাঠামোগত হয়নি বরং পরিবর্তন হয়েছে শিশুদের নিত্য দিনের রুটিনেও। কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্যে অহিদের চোখে ধরা পড়েছে নতুন কিছু ফ্লাইওভার, মেট্রো রেল এবং মনো রেল। তবে টাচক্রিন ফোনটাও ধরা পড়েছে তার চোখে।

শত অপরিচিতর মধ্যে তার কাছে এখনো সবচে চেনা মনে হয় যে ট্রেনে হামলার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিলেন তিনি।তার জন্য আরেকটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল পরিবারের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারা।

অন্য রকম প্রত্যাশা

অহিদের দুই সন্তান। ১১ বছর বয়সী উমর এবং ১০ বছর বয়সী উমরাহ। বাবার গ্রেফতারের সময় তারা একেবারে শিশু ছিল। তার স্ত্রী ও স্কুল শিক্ষক, তিনিই বাচ্চাদের বাবার কাছে জেলে নিয়ে যেতেন। অহিদ তাদের তখন হাতে তৈরি বিভিন্ন জিনিস, ফুল, চকলেট ইত্যাদী দিতেন। সে সবকিছুই এখনো সাজানো রয়েছে তার ঘরে।

‘আমার কাছে আমার বাচ্চাদের দাবিগুলো অন্যরকম। কথা না শুনলে আমি যদি তাদের বকা দেই তবে তারা প্রচুর কান্নাকাটি করে। তবে তাদের মা এরকমটি করলে তারা এরকম করে না। তারা আমার কাছে থেকে শুধুই ভালোবাসা চায়, শাসন না।’

wahid2

স্বামীর অনিচ্ছা সত্বেও গ্রেফতারের পর স্কুল শিক্ষকের চাকরি নেন অহিদের স্ত্রী। তিনি বলেন, আমাদের সমাজে নারীরা সাধারণত বাহিরে কাজ করে না এজন্যই স্ত্রীর কাজ করাকে মেনে নিতে পারেনা।

নিজের চাকরিটা স্থায়ী হলে দু’জন মিলে স্ত্রীর চাকরি করা না করার বিষয়টি ঠিক করবেন বলে জানান অহিদ। তার স্ত্রীও মত দিয়ে বললেন, সংসারের কাজ করে স্কুল করা আমার জন্য খুব কষ্টকর।

বাবাকে ফিরে পেয়ে খুশি কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে অহিদের ছেলে উমর বলেন, না, আমি আরো বেশি খুশি হতাম যদি দেখতাম আমার চাচারা মুক্তি পেয়েছেন।

সবাই নিরাপরাধ

একই মামলায় যাবজ্জীবন কারদণ্ড হয়েছে উমরের চাচার।

অহিদ বলেন, তিনি এখনও তার ভাইদের নিয়ে চিন্তা করছেন যারা এখনো জেলে রয়েছেন। তিনি বলেন, যেসব খাবার জেলখানায় পাওয়া যায় না সেগুলো খাওয়ার সময় আমার তাদের কথা মনে পড়ে। মুক্তি পেয়েছি বলে আমি খুশি, কিন্তু তারা সকলেই যদি মুক্তি পেত তবে সেটা অনেক ভালো হতো। আমিই একমাত্র নিরাপরাধ নই, তারা সকলেই নিরাপরাধ।

আইনজীবী হওয়ার জন্য পড়াশুনা করছেন অহিদ। তার সঙ্গীদের নিরাপরাধ প্রমাণ করার জন্য কাজ করে যেতে চান অহিদ।

বন্দি অবস্থায় শাস্তি নিয়েও কথা বলেন অহিদ। জেলে থাকা অবস্থায় শাস্তির কারণে একবার অসুস্থ হয়ে চিকিৎসাও নিতে হয়েছে তাকে।

‘জেল থেকে ফিরে সুখ খুঁজে ফিরছেন তিনি। এখনো মাঝে মাঝে চিন্তিত এবং বিরক্ত অনুভব করে সে। কথা বলার সময় হঠাৎই তার চিন্তার ট্রেন চলে যায় জেলখানা এবং সেখানে বন্দিদের কাছে।’ বলছিলেন তার স্ত্রী।