ষাট বছরের আব্দুর রশিদ তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র

আপডেটঃ ১১:৩৩ অপরাহ্ণ | অক্টোবর ৩১, ২০১৬

সি এন এ  নিউজ,দিনাজপুর : দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার যোশহর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণির ক্লাস রুমে গেলে চোখে পড়বে এক আশ্চর্য দৃশ্য। ষাট বছরের এক বৃদ্ধ তৃতীয় শ্রেণির শিশুদের সঙ্গে একই বেঞ্চে বসে ক্লাস করছেন। প্রথমে দেখে মনে হতে পারে হয়তো তিনি ওই ক্লাসের শিক্ষক। কিন্তু না ষাট বছরের বৃদ্ধ আব্দুর রশিদ ওই ক্লাসেরই একজন ছাত্র।

‘বহু বৃদ্ধকে দেখিয়াছি যাঁহাদের বার্ধক্যের জীর্ণাবরণের তলে মেঘলুপ্ত সূর্যের মতো প্রদীপ্ত যৌবন’-তিনি যেন কাজী নজরুল ইসলামের যৌবনের গান প্রবন্ধে বর্ণিত সেই তরুণ। যিনি ষাট বছরে এসেও তারুণ্য দেখিয়েছেন। যে বয়সে রশিদের থাকার কথা শয্যাশয়ী হয়ে, সে বয়সেই কিনা তিনি স্কুলে যাচ্ছেন জ্ঞান অর্জন করতে।

মানুষের জীবনে শিক্ষা যে কতটা প্রয়োজন তা তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন ৬০ বছর বয়সে। দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার যোশহর শাহপাড়া গ্রামের এই বৃদ্ধ মানুষটি সঠিক সময়ে শিক্ষা গ্রহণ না করায় কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তা তিনি এখন বুঝতে পারছেন। তাই তিনি শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার লক্ষ্যে ৬০ বছর বয়সে যশোহর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে নিয়মিত ক্লাস করছেন।

যার শুরু হয়েছিল ২০১৪ থেকে। সে বছরই তিনি প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হন। একে একে প্রথম, দ্বিতীয় শ্রেণি পাশ করে এখন তিনি তৃতীয় শ্রেণিতে অধ্যরনরত। ক্লাসের শিশু সহপাঠীদের সাথে একই বেঞ্চে বসে শিক্ষকদের কাছ থেকে পাঠ গ্রহণ করছেন তিনি। প্রথম প্রথম তার সহপাঠি শিশু শিক্ষার্থীরা বিষয়টি অন্যভাবে নিলেও এখন তারা বেশ মানিয়ে নিয়েছে। শিশুরা আব্দুর রশিদকে ক্লাসে পেয়ে বেশ আনন্দিত। তার সাথে মানিয়ে নিতে তাদের কোন সমস্যা হচ্ছেনা বলে তারা জানিয়েছে।

বোচাগঞ্জ উপজেলার ৫নং ছাতইল ইউনিয়নের যোশহর শাহপাড়া গ্রামের মৃত নেক মোহাম্মদের পুত্র আব্দুর রশিদ জানান, ১৫ বছর আগে তার স্ত্রী মারা যায়। সে সময় এলাকার এক ব্যক্তির কাছে তিনি তার ৪০ শতাংশ জমি ফেরৎ নেওয়ার শর্তে বন্ধক দেন। এক বছর পর টাকা পরিশোধ করে জমি নিতে গেলে ওই ব্যক্তি তাকে বলেন তুমি তো আমাকে জমি রেজিস্ট্রি করে দিয়েছো এখন আমি জমি ফেরত দেব কি করে। এ কথা শুনে আব্দুর রশিদ খুবই মর্মাহত হন এবং সেদিনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন শিক্ষা গ্রহণ করবেন। এ বিষয়ে আব্দুর রশিদ বলেন, ‘আগে অন্ধ ছিলাম, এখন আলো দেখতে এসেছি।’

স্কুলের প্রধান শিক্ষক অনিল চন্দ্র রায় জানান, প্রথমে তাকে ভর্তি নিতে অনিহা প্রকাশ করলেও এলাকাবাসীর অনুরোধে তাকে স্কুলে ভর্তি করা হয়। স্কুলে ক্লাসের পাশাপাশি আব্দুর রশিদ পার্শ্ববর্তী জংলীপীড় বাজারে একটি কোচিং সেন্টারে নিয়মিত কোচিং করেন।

বোচাগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোছা. আরজুমান্দ বানু জানান, বয়সে বড় হলেও শিক্ষার কোনো বয়স নেই। যেহেতু ৬০ বছর বয়সে তিনি শিক্ষা গ্রহণ করতে এসেছেন তাই বিষয়টি অন্যান্য নিরক্ষর মানুষের কাছে অনুকরণীয় হবে। অন্যরা উৎসাহিত হয়ে তার মত যদি শিক্ষা গ্রহণ করে তাহলে জাতিও শিক্ষিত হবে।

আব্দুর রশিদের এখন একটাই স্বপ্ন তাকে শিক্ষিত হতে হবে। ভবিষ্যতে তাকে যেন কেউ আর ঠকাতে না পারে। বর্তমানে আব্দুর রশিদের এক মেয়ে, দুই নাতনী ও এক নাতী রয়েছে। বড় নাতনী কলেজে পড়ছে। বৃদ্ধ বয়সে বাড়ীর অন্যান্য কাজের সাথে স্কুলে যাওয়া, লেখা-পড়ায় মনযোগী হওয়া ও ছোট শিশুদের সঙ্গ দেওয়ায় নিজেকে এখনও একজন শিশুই ভাবেন আব্দুর রশিদ।