মৃত্যু আমার পিছু ছুটেছে; আমি ভয় পাই না

আপডেটঃ ২:২৯ অপরাহ্ণ | আগস্ট ২২, ২০১৬

সি এন এ  নিউজ,প্রতিবেদক : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘মৃত্যু বারবার আমার পিছু ছুটেছে; আমি ভয় পাই না। যত বাধাই আসুক, আমি জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাবো।’

রবিবার বিকেলে ২১ আগস্টের শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও দোয়া নিবেদন শেষে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আল্লাহ প্রতিটা মানুষকে কিছু কাজ দিয়ে দুনিয়ায় পাঠান। আমার কিছু কাজ হয়তো এখনো বাকি আছে। সেজন্য তিনি আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। আমি মৃত্যুর পরোয়া করি না। আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে মাথা নত করি না। কারণ আমি সব সময় ভাবি- আমি জাতির জনকের কন্যা। মরার আগে আমি মরতে চাই না।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘স্বাধীনতাবিরোধী আন্তর্জাতিক চক্রান্ত বাংলাদেশের জঙ্গিবাদে মদদ দিচ্ছে। বাংলাদেশ যখন সুষ্ঠুভাবে চলছে, কিছু বিদেশি শক্তি যারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, তাদের চক্রান্ত এখনো চলছে। জঙ্গিবাদ দূর করতে আমরা যখন বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে চলছি, তখন তারা জঙ্গিবাদে মদদ দিয়ে নানা ঘটনা ঘটাচ্ছে।’

আমেরিকার অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমেরিকাতে বাংলাদেশি ইমামসহ মুসল্লিকে হত্যা করা হলো। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নাজমুলসহ কানেকটিকাটেও বাংলাদেশি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত সব সময় ছিল। যেখানে জাতির পিতাকে পর্যন্ত হত্যা করা হয়েছে। যিনি একটি দেশ দিয়েছেন, স্বাধীনতা দিয়েছেন, একটি মানচিত্র, পাসপোর্ট দিয়েছেন- তাকেও হত্যা করা হয়েছে।’

২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় বিএনপি-জামায়াত জড়িত ছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তার সপক্ষে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেন।

২০০৪ সালের ২১ আগস্টের পর বিএনপির আচরণ সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এ ঘটনা বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছিল কিন্তু তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারকে নাড়া দেয়নি। উল্টো বলল, গ্রেনেড হামলার ঘটনা আমরাই ঘটিয়েছি। সারা বাংলাদেশে রটালো এই ঘটনা আমরাই ঘটিয়েছি। আমার প্রশ্ন-আমরা কি সেদিন সেখানে সুইসাইড করতে গিয়েছিলাম। এত বড় মানবতাবিরোধী ঘটনার পর সংসদে কথা বলতে দেয়নি বিএনপি সরকার। আমি তখন বিরোধীদলীয় নেতা। কী দুর্ভাগ্য, নিন্দা প্রস্তাবও নেওয়া হয়নি সংসদে। এতেই স্পষ্ট হয় কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল।’

তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া এ ঘটনার কিছুদিন আগে বক্তব্যে বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী তো দূরের কথা আমি বিরোধীদলীয় নেতাও হতে পারব না। গ্রেনেড হামলার পর খালেদার এ বক্তব্য প্রকাশ পেতে শুরু করে- কেন বলেছিলেন আমি বিরোধীদলীয় নেতাও হতে পারব না। এর আগে খালেদার পুত্র তারেক রহমান ধানমন্ডি ৫ নম্বরে তার শ্বশুরবাড়িতে এক টানা দশ মাস ছিল। পয়লা আগস্ট সেনানিবাসের বাসায় ফিরে যায়- টানা এত দিন ধানমন্ডিতে কেন ছিল, সেখানে ষড়যন্ত্র করতে সুবিধা? তাদের প্রতিটি বক্তব্যে আভাস ছিল আমাকে হত্যার।’

২১ আগস্ট গেনেড হামলার পর পুলিশ প্রশাসনের আচরণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ওই দিনের ভয়াবহ এ হামলায় আওয়ামী লীগের ২২ নেতাকর্মী মৃত্যুবরণ করেছেন। অজ্ঞাত ছিল আরও দুই জন। জানি না তারা কারা- হয়তো হামলাকারীরাও হতে পারে। এত বড় একটি ঘটনা ঘটল, পুলিশ ছিল নীরব। চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ, আহত মানুষদের আর্তনাদ। অবাক লাগে এত বড় ঘটনা ঘটার পরও পুলিশের কোনো তৎপরতা ছিল না। সেখানে আহত মানুষ কাতরাচ্ছে তাদের উদ্ধার না করে, পুলিশ তৎকালীন সরকারের নির্দেশে টিয়ার (কাঁদানে) গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে। আমি জানি না- পৃথিবীতে এমন ঘটনা ঘটেছে কি-না।’

গ্রেনেড হামলার বিরুদ্ধে তৎকালীন সরকারের নিষ্ক্রিয়তার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘হামলাকারীরা যাতে নিরাপদে, নির্বিঘ্নে চলে যেতে পারে, সেজন্যে টিয়ার গ্যাস ছুড়েছে। লাঠিচার্জ করা হয়েছে। একটি ঘটনা ঘটলে সরকারের পক্ষ থেকে আলামত সংগ্রহ করে, সংরক্ষণ করে। কিন্তু তারা আলামত নষ্ট করেছে। যতটা সম্ভব হয়েছে নিজেদের নেতাকর্মীরা আলামত সংগ্রহ করেছে। বিএনপি এ ঘটনার তদন্ত করল না, আলামত সংগ্রহ করল না। কোথাকার, কোন গ্রামের একজনকে ধরে জজ মিয়াকে দিয়ে নাটক সাজালো সে হামলা করেছে।’

সেদিনের হাসপাতালগুলো ও ডাক্তারদের আচরণের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সেই দিন হাসপাতালগুলোতে বিএনপি মনোভাবাপন্ন একজন ডাক্তারকেও খুঁজে পাওয়া যায়নি। আমাদের (আওয়ামী লীগ) মনোভাবাপন্ন ডাক্তাররা হাসপাতালগুলোতে ছুটে গিয়েছে। কী জঘন্য মনোভাব নিয়ে তারা চলেছে!’

নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা দুঃখী মানুষের ভাগ্যোন্নোয়নে কাজ করছি। জাতির পিতা যে দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে সারাজীবন লড়াই-সংগ্রাম করে গেছেন সেই লক্ষ্য নিয়ে আমিও কাজ করে যাচ্ছি। আমরা মানুষের ভাগ্যন্নোয়নে কাজ করছি বিনিময়ে গুলি, বোমা ও গ্রেনেড হামলার শিকার হচ্ছি।’

রবিবার ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার এক যুগ পূর্তিতে গুলিস্তানের ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ ওই দিন নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে অস্থায়ী বেদী স্থাপন করে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী প্রথমে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে তাদের স্মরণে নীরবতা পালন ও দোয়া-মোনাজাত করা হয়। এরপর সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শেষে ২১ আগস্ট নিহতদের স্বজন ও আহতদের সঙ্গে দেখা করেন। তাদের খোঁজখবর নেন। তাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। এ সময় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা এবং সরকারের মন্ত্রীগণ উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ ত্যাগ করার পর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ২১ আগস্টের অস্থায়ী শহীদ বেদীতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।