অসহায়দের পাশে একদল বঞ্চিত মানুষ

আপডেটঃ ১২:৫১ অপরাহ্ণ | এপ্রিল ১৭, ২০২০

সি এন এ নিউজ,ডেস্ক :ধন নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য চাই মন। দুস্থ, অসহায় মানুষের সেবায় রাজধানীর তৃতীয় লিঙ্গের একদল মানুষ মানবিক মন নিয়ে এগিয়ে এসেছেন। যারা নিজেরাই সমাজে বিভিন্নভাবে বঞ্চিত তাদের এমন উদ্যোগ প্রশংসা কুড়াচ্ছে।

বৈশ্বিক মহামারির কষাঘাতে জর্জরিত পৃথিবী। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় চলছে লকডাউন। এতে সবচেয়ে বেশি অসহায় হয়ে পড়েছেন শ্রমিক, দিনমজুর; নিম্নবিত্ত সাধারণ মানুষ। তাদের দিকে এবার যারা সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন, তারা নিজেরাই সমাজে অবহেলিত। নেই সামাজিক স্বীকৃতি। সমাজে তাদের পরিচয় ‘হিজড়া’। তাদেরই উদ্যোগ এবং প্রচেষ্টায় অসহায় বস্তিবাসীদের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি গত কয়েকদিন তারা সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করেছেন, জীবাণু নাশক স্প্রে ছিটিয়েছেন। জানা গেছে, আগামী রোববার থেকে আবারো শুরু করবেন বাড়ি বাড়ি গিয়ে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার কাজ।

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের নিয়ে কাজ করে ‘বৃহন্নলা’। এই সামাজিক সংগঠনের ব্যানারে দেওয়া হচ্ছে ত্রাণ। রাজধানীর কমলাপুর টিটি পাড়া বস্তি এলাকার প্রায় শতাধিক পরিবারে তারা ত্রাণ পৌঁছে দিয়েছে। ত্রাণসামগ্রীর মধ্যে ছিল চাল, ডাল, তেল, লবণ, আলু এবং সাবান। যা দিয়ে চারজনের একটি পরিবার পাঁচদিন চলতে পারবে।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে সংগঠনের কর্ণধার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদিকুল ইসলাম সাদিক বলেন, বিশ্ব ভয়াবহ মহামারিতে আক্রান্ত! ভয়াবহতা এড়াতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা অঘোষিত লকডাউনে থাকায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে আমরাও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।

সাদিক আরো বলেন, আমরা বৃহন্নলাদের সঙ্গে নিয়ে গত এক সপ্তাহ ধরে করোনার বিস্তার ঠেকাতে বিভিন্ন ধরনের কাজ করে যাচ্ছি। এর মধ্যে রয়েছে শাহজাদপুর বস্তি এলাকায় হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিতরণ, সায়দাবাদ, যাত্রবাড়ি, পলাশী, আজিমপুর, চাঁনখার পুল, ঢাকা মেডিকেল এলাকায় গণপরিবহনে, ঘনবসতিপূর্ণ জেনেভা ক্যাম্প এলাকায়, এম্বুলেন্সে জীবানু নাশক স্প্রে করা, মানুষকে সচেতন করা, কমলাপুর বস্তিতে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ উল্লেখযোগ্য।

জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় জীবাণু নাশক স্প্রে

‘বৃহন্নলা’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক সংগঠন। সংগঠনটি হিজড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কাজ করে। পাশাপাশি সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিও তাদের রয়েছে দায়িত্ববোধ। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের নিয়ে কেন এমন কর্মসূচি নিলেন- জানতে চাইলে সাদিক বলেন, আমাদের দেশে এ জনগোষ্ঠীর মানুষকে সমাজের অনেকে ভালোভাবে দেখেন না। তারা মনে করেন, এরা সমাজের জন্য ‘বার্ডেন’। আমরা দেখিয়ে দিতে চাই দেশ ও সমাজের প্রয়োজনে তারাও সমানভাবে কাজ করতে পারে। যদি তাদের কাজে লাগানো যায় তবে তারা সমস্যা নয় বরং সম্পদে পরিণত হবে।

তাছাড়া কাজটি হিজড়া সম্প্রদায়ের সবাই খুব উৎসাহের সঙ্গে করছেন। এতে ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে সমাজের সঙ্গে না-মেশার ফলে যে সঙ্কীর্ণতা ছিল তা কেটে যাবে এবং তারা নিজেদের সমাজেরই অংশ মনে করবে বলে ‘বৃহন্নলা’র কর্মীদের বিশ্বাস।

এদিকে দেশের এমন দুর্যোগে বঞ্চিত হিজড়া জনগোষ্ঠীর সদস্যদের মানব সেবামূলক এই কার্যক্রমকে প্রশংসার চোখে দেখছে সচেতন সমাজ। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচিত হয়েছে।  আহসানুল হক নামে একজন বৃহন্নলার কর্মকাণ্ডের ছবি ফেইসবুকে শেয়ার করে লিখেছেন: ‘এভাবে সমাজের প্রতিটি স্তরের জনগোষ্ঠী এগিয়ে এলে করোনার বিরুদ্ধে আমরা জয়ী হবোই। যারা মনে করেন, হিজড়া সম্প্রদায় আমাদের কোনো কাজে আসে না, তাদের জন্য এটি একটি বড় শিক্ষা। যখন দেশের অনেক সামর্থ্যবান এগিয়ে আসছেন না, তখন তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাঠে আছেন। এটি অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।’

শাওন ইসলাম ফেইসবুকে এ প্রসঙ্গে লিখেছেন: ‘পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী হিসেবে যখন তাদের নিয়ে আমাদের ভাবা উচিত, তখন তারা নিজেদের কথা না ভেবে আমাদের জন্য এগিয়ে এসেছে। স্যালুট তাদের।’