উদ্বিগ্ন অভিভাবক ও পুলিশ টঙ্গীতে সক্রিয় গ্যাং কালচার

আপডেটঃ ১০:২৫ পূর্বাহ্ণ | মার্চ ০১, ২০২০

নাঈমুল হাসান,সি এন এ  নিউজ,টঙ্গী : গাজীপুরের টঙ্গীতে কিশোর গ্যাং এখন একটি আতঙ্কের নাম। দিনদিন গ্যাং কালচারকে চাঙ্গা করতে গিয়ে নানা অপরাধের সঙ্গে জরিয়ে পড়ছে কিশোররা। গ্যাং গ্রুপের আতঙ্কে শিক্ষক, সচেতন অভিভাবক ও পুলিশকে ভাবিয়ে তুলেছে।
ইতিমধ্যে গ্যাং সদস্যদের হাতে নগরীতে একাধিক হত্যাকান্ড,ধর্ষণ,কুপিয়ে জক্ষম,ছিনতাই,চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধ ঘটেছে। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকায় কিশোর গ্যাং গ্রুপের কয়েকটি গ্রপের সদস্যরা র‌্যাব ও পুলিশের হাতে আটকও হয়েছে।
স্কুল-কলেজের গন্ডি পেরোনোর আগেই নগরীর প্রায় প্রতিটি এলাকায় প্রভাব বিস্তার নিয়ে উঠতি বয়সী কিশোরদের বেপরোয়া আচরণ ,এক গ্রুপের সঙ্গে আরেক গ্রুপের রক্তক্ষয়ী এই সংঘাত নগরীর বাসিন্দাদের জন্য অন্যতম এক উদ্বেগের কারণ।
স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে মেয়েদের ইভটিজিং, উচ্চস্বরে হর্ণ বাজিয়ে মোটরসাইকেল চালানো, আধিপাত্য নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারির ঘটনা প্রায় ঘটছে। গ্যাং সদস্যদের জন্মদিনের নামে বৈদ্যুতিক তারের খুটির সঙ্গে হাত-পা বেঁধে ডিম নিক্ষেপ ছাড়াও মাথায় আটা-ময়দা মাখিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে।
মাদক, নারী, স্ট্যান্ড দখল এবং সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দসহ নানা ছোটখাটো বিষয় নিয়ে প্রায়ই ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, সংঘর্ষ ও হত্যার মতো ঘটনা ঘটছে। কিশোর গ্যাং সদস্যদের মধ্যে কেউ কেউ দিন মজুরের সন্তান হয়েও হাঁকিয়ে বেড়ায় দামি মোটর সাইকেল।
গ্যাং গ্রুপ সদস্যদের অনেকের অভিভাবক প্রভাবশালী ও পরিচিত মুখ। আবার অনেকে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ফলে অপরাধ করলেও কেউ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পাচ্ছে না। এসব অপরাধের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নিতেও ভয় পান অনেকে। বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা ধরা পড়লেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।
যেভাবে গড়ে উঠে গ্যাং কালচার: বিদ্যালয়ের কিছু উশৃঙ্খল একাধিক শিক্ষার্থী বাহিরের বখাটেদের সঙ্গে মিশে একটি গ্যাং তৈরী করে। বিদ্যালয়ের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন চায়ের দোকানে আড্ডা জমায়। নিজেদের গ্রুপের যোগ করে চোরাই মোটর সাইকেল,ডিএসএলআর ক্য্রামেরা,সুইচ গিয়ার,চাপাতি,হক স্টিকসহ নানা ধরনের দেশিয় অস্ত্র। নিজেদের গ্রুপের প্রতিক হিসেবে এক ধরনের চুল কাটা,হাতে গ্রুপের লোগো সম্বলিত হ্যান্ড বেল্ড। নিজেদের মধ্যে সহজেই যোগাযোগ করতে একাধিক ফেইসবুক মেসেঞ্জার গ্রুপ খুলে ভয়ংকর তৎপরতা চালায়। মেসেঞ্জার গ্রুপে তারা বিভিন্ন ধরনের ধারালো অস্ত্র কেনা বা সংগ্রহের জন্য বার্তা আদান-প্রদান করছে। গ্রুপ সদস্যরা তাদের রাজনৈতিক বড় ভাইদের সঙ্গে দেখা করার জন্য সময় ও স্থান নিয়ে ওই মেসেঞ্জার গ্রুপ গুলোতে বার্তা আদান-প্রদান করে। এছাড়া ফেইসবুক আইডিতে তারা নিজেদের বিচ্ছু,ডন, ব্যাডবস এসটি, বড় পোলাপাইন,নষ্ট ছেলে,শিকার এমন নানা নাম গ্যাং কালচার চালিয়ে আসছে। আর সচরাচর কিশোর গ্যাং গ্রুপগুলো সামান্য বিষয় নিয়েই বিবাদে লিপ্ত হয়ে যায়।
গ্যাং সদস্যদের হাতে হত্যা: এর আগে গত ৭ জুলাই নগরীর টঙ্গী পূর্ব থানার বিসিক পাগারের ফকির মার্কেট এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ফিউচার ম্যাপ স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র শুভ আহাম্মেদকে (১৬) কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার কয়েকদিন পর ২৪ জুলাই একই থানার গাজীপুরা কাজীপাড়া চন্দ্রিমা এলাকায় বাসায় ঢুকে তৌফিজুল ইসলাম মুন্না (১৫) নামে এক স্কুলছাত্রকে খুন করা হয়।
গত ১ মার্চ নাহিদ বিকালে টঙ্গী পূর্ব থানাধীন ভরান মুন্সীপাড়া রোডে তার শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার সময় ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে প্রিন্স মাহমুদ নাহিদকে(১৮) ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়।

যেসব এলাকায় গ্যাং গ্রুপ সক্রিয়: টঙ্গীর প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডে দিনদিন এ গ্যাং কালচার গড়ে উঠছে। এদের মধ্যে টঙ্গী বাজার এলাকায় বেডবস এসটি, পূর্ব আরিচপুর এলাকায় বড় পোলাপাইন, গাজীপুরা সাতাইশ এলাকায় বিচ্ছু, এরশাদ নগর এলাকায় নষ্ট ছেলে, মিরাশ পাড়ার ও পাগাড় এলাকার একাংশে শিকার নামক গ্যাং গ্রুপের সক্রিয়তা দেখা যায়।
টঙ্গীর সিরাজ উদ্দিন সরকার বিদ্যানিকেতন এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো.ওয়াদুদুর রহমান প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ইন্টারনেট আসক্তি, র‌্যাগ ডে কালচার, সামাজিক, পারিবারিক ও নৈতিক অবক্ষয়, হিরোইজম, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ এবং খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড ও ধর্মীয় নৈতিক শিক্ষার পরিবেশ কমে যাওয়াসহ সর্বোপরি সন্তানের গতিবিধির প্রতি অভিভাবকের নজর না থাকায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কিশোরদের ওপর।
টঙ্গী সম্মেলিত সাংকৃতিক জোটের সাধারন সম্পাদক শেকানুল ইসলাম শাহি বলেন, অপসংকৃতির প্রভাব,খেলাধুলা ও মেধার বিকাশ হচ্ছেনা। ছোট থেকেই মোবাইল ফোনে আসক্তি,রাজনৈতিক দুষ্ট চক্রের প্রভাব ও পারিবারিক শিক্ষাকেই দায়ী করেন তিনি।
টঙ্গী সরকারী কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম জানান,গ্যাং কালচার মুছে ফেলতে হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক নেতাদের নিকট থেকে নৈতিক শিক্ষার উপর জোড় দেওয়া যেতে পারে।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো.আনোয়ার হোসেন বলেন, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করতে হলে পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। ইতোমধ্যে গাজীপুর মহানগরীতে থাকা স্কুল-কলেজ গুলোতে পুলিশের পক্ষ থেকে ভালো কাজে প্রেষণা,মন্দ কাজ গুলোতে অনুৎসাহীত মূলক বিশেষ ক্লাস চালু রয়েছে।