‘দে, দে… হামাক অ্যানা ভাত দে’

আপডেটঃ ২:৪৮ অপরাহ্ণ | ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২০

নওগাঁ সংবাদদাতা :‘দে, দে… হামাক অ্যানা ভাত দে’ বলে চিৎকার করেন। সচল বাম হাতটি বাড়িয়ে দেন। একমুঠো খাবারের জন্য সারাদিন পথের দিকে চেয়ে থাকেন। পথচারীদের দেখে বাম হাতটি এগিয়ে দিয়ে ভাত খাবার জন‌্য আকুতি জানান।

বলছিলাম নওগাঁর অসহায় প্রতিবন্ধী ময়নার কথা। বয়স এখন প্রায় ৭০ ছুঁইছুঁই। সদরের মসরপুর দক্ষিণপাড়া গ্রামের মৃত মিরি ফকিরের স্ত্রী ছিলেন ময়না।

বোবা ও কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন মাহমুদা নামের এক কিশোরীকে ভিক্ষুক মিরি ফকির ভিক্ষা করতে গিয়ে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন। এরপর তিনি তাকে নিয়ে আসেন নিজের ভাঙা ঘরে। বিয়ে করে মিরি ফকির মাহমুদার নাম রাখেন ময়না।

প্রতিবেশী নজরুল ইসলামের একখণ্ড জমিতে তালপাতার তৈরি ছোট্ট বসতি ঘরে একসঙ্গে ভিক্ষা করতেন তারা।  খেয়ে না খেয়ে কোনোমতে চলছিল ময়না এবং মিরি ফকিরের সংসার।

কিন্তু ভিক্ষুক স্বামী মিরি মারা গিয়েছে প্রায় ২৫ বছর আগে। এরপর থেকে একা কখনো নওগাঁর বালুডাঙ্গা আবার কখনো নওহাটা বাসস্ট্যান্ডে ভিক্ষা করতেন ময়না।  রাতে কখনো খোলা আকাশের নিচে আবার কখনো যাত্রী ছাউনিতে খেয়ে না খেয়ে চলছিল ময়নার জীবন।

তার এই কষ্টের কথা ভেবে প্রতিবেশীরা সকলে মিলে পুনরায় তাকে নিয়ে আসেন স্বামীর ঠিকানায়।

পরে তারা তৈরি করে দেন এক ঝুপরি (বসতি) ঘর।

বর্তমানে সেই ভাঙা ঘরে পলিথিনের বিছানায় থাকেন ময়না। ঘরে নিত‌্যসঙ্গী বলতে মশা, মাছি, পোকামাকড় আর ঠান্ডা বাতাস। নেই ভাল মানের বিছানা বা কোনো আলো। ময়নার ডান হাত ও ডান পা একেবারে অচল। এজন্য তার প্রাকৃতিক কাজকর্ম সারতে হয় বিছানাতেই। দুর্গন্ধে সেখানে ভন ভন করে মাছির দল।

কিন্তু চিকিৎসা বা দু’বেলা দুমুঠো খাবার কিংবা মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের জন্য সরকারি কোনো সাহায্য কোনো দিনই জোটেনি ময়নার। পাননি বেসরকারি কোনো অনুদানও।

জমির মালিক প্রতিবেশী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বয়স্ক এই নারীর বিষয়টি ভাবতেও কষ্ট লাগে। এই ঠাণ্ডার মধ্যে আলো বাতি ছাড়া অচল হাত-পা নিয়ে এক মানুষ আর কতদিন বাঁচতে পারে। সরকারি কোনো জায়গায় অথবা বৃদ্ধাশ্রমে নিয়ে গেলে সে হয়তো বাঁচত। তার এই অবর্ণনীয় কষ্ট দেখে আমাদের খুব খারাপ লাগে।’

অসহায় মাহমুদাকে দেখাশোনার কাজে স্বেচ্ছায় নিয়োজিত প্রতিবেশী সাহারা বানু বলেন, ‘হামি মানষের (মানুষের) বাড়িত কাম (কাজ) করে খাই। আশপাশের লোকেরা প্রতিদিন ময়নাক খাবার দেয় হামি সেডা (সেই খাবার) লিয়া যাইয়া ওক খিলাইয়া বিচনা (বিছানা), কাপড় বদলে দিয়া আসি।’

প্রতিবেশী ডা. মোহাব্বত আলী বলেন, ‘বছর দুয়েক আগে ময়না স্ট্রোক করেছিলো।  আমি আমার ক্লিনিকে নিয়ে তাকে চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এখন আমরা প্রতিবেশীরা সবাই মিলে সাহারা বানুর মাধ্যমে খাবার দিয়ে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি। তার বিষয়টি নিয়ে উপজেলা সমাজ সেবা অফিস, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যের কাছে গত দুই বছর ধরে ঘুরেছি। শুধু একটা কম্বল দেয়া ছাড়া কিছুই করতে পারেনি তারা। অগত্যা নিজে যখন যতটুকু সম্ভব করার তাই করছি।’

প্রতিবেশী রফিকুল ইসলাম রফিক জানান, সরকারিভাবে এমন হত দরিদ্র আর অসহায় মানুষদের জন্য ঘর, টিন, সোলার, স্যানিটারি ল্যাট্রিন, টিউবওয়েল, চাল দেয়া হয়। অথচ হতভাগী ময়না সব কিছু থেকে বঞ্চিত। সরকারি সহযোগিতা ছাড়া তার পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।

হাপানিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আফসার আলী বলেন, ‘আমি তাকে চিনি। এখন তিনি পঙ্গু। কিছুদিন আগে তাকে একটা কম্বল দিয়েছি। তবে তার কোনো অভিভাবক নেই। থাকলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলে হয়তো তার নামে একটা কার্ড করে দিতাম।’

নওগাঁ সদর উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা সাইদুর রহমান বলেন, ‘আমি এখানে অল্পকিছুদিন আগে এসেছি। ময়না প্রতিবন্ধী, বয়স্ক কিংবা বিধবা এর কোন প্রকার ভাতাভোগী না হওয়ার বিষয়টি সত্যি অমানবিক। তার এনআইডি কার্ড এবং ছবিসহ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাকে প্রতিবন্ধী ভাতার একটা ব্যবস্থা করে দেবো।’