তুরাগ তীরে লাখো মুসল্লির জুমা আদায়

আপডেটঃ ৫:২৬ অপরাহ্ণ | জানুয়ারি ১০, ২০২০

সি এন এ  নিউজ,টঙ্গী (গাজীপুর) : আম ও খাস বয়ান, তালিম ও তাশকিল, নামাজ-কালাম ও জিকির-আসকারের মধ্য দিয়ে টঙ্গীর তুরাগতীরে কাটল বিশ্ব ইজতেমার প্রথম দিন। এদিন জুমার জামাতে শরিক হন কয়েক লাখ মুসল্লি। মাঠে জায়গা না পেয়ে আশপাশের রাস্ত, বাড়িঘর, দোকানপাট এমনকি নদী ও সড়কে বিভিন্ন যানবাহনেও শরিক হন জুমার জামাতে।
বেলা ১টা ৩০ মিনিটে কাকরাইল মসজিদের পেশ ইমাম হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ জুবায়ের আহম্মেদ উত্তরা ১০নং সেক্টরের বেলাল মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে এ জামাতে ইমামতি করেন। এ সময় ইজতেমা ময়দান ও তার আশপাশের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে পিনপতন নিরবতা নেমে আসে।
শুক্রবার বাদ ফজর পাকিস্তানের মাওলানা খুরশিদের আম বয়ানের মধ্য দিয়ে ইজতেমার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। তবে এর আগের দিন বৃহস্পতিবার আসরের পরই শুরু হয়েছিল ইজতেমার কার্যক্রম।
রোববার আখেরী মোনাজাতের মধ্য দিয়ে আলমী শূরার তত্বাবধানে শেষ হবে ৫৫তম এ আয়োজনের প্রথম পর্ব।
জুমার নামাজে অংশ নিতে সকাল থেকেই ইজতেমা ময়দানমুখী মানুষের ঢল নামে। সময় যত গড়াতে থাকে এ ঢল বাড়তে থাকে। দুপুর ১২টার মধ্যেই ভরে যায় মাঠ। পরে মাঠে জায়গা না পেয়ে মুসল্লিরা জায়নামাজ, হোগলা-পাটি, পলিথিন, চট ও পলিবস্তা, বাঁশ কাগজ, খবরের কাগজ বিছিয়ে বসে পড়েন মাঠের রাস্তুা, আশপাশের গলি ও ভবনে।
১টার দিকে তাতেও ঠাঁই না হলে মুসল্লিরা ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-আবদুল্লাপুর, টঙ্গী-কালীগঞ্জ সড়ক এবং তুরাগ নদে (নৌকাসহ বিভিন্ন বাহন) বসে পড়েন। স্থানীয়রা বলেন, সাম্প্রতিককালের মধ্যে এত মুসল্লি এর আগে হয়নি। এটিকে তাই বৃহত্তম জুমার জামাত বলছেন তারা।
নামাজ শেষে একসঙ্গে ফিরতে গিয়ে পরিবহন সংকটে বিপাকে পড়েন মুসল্লিরা। পরিবহনগুলো আদায় করে অতিরিক্ত টাকা। এরপরও হেঁটেই ফিরতে হয় বেশিরভাগ মানুষকে। ইজতেমা নিয়ে সংঘাতের শঙ্কা না থাকায় নির্বিঘ্নেই কেটেছে মুসল্লিদের। এ ছাড়া আবহাওয়া ভালো থাকায় মুসল্লিরাও বয়ান-তাশকিলে মনোযোগ দিতে পারছেন।
ফিরে যাচ্ছেন মুসল্লি: দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা থেকে আগত মুসল্লিদের জন্য নির্ধারিত স্থানের বাইরেও  অবস্থান নিয়েছেন লাখো মুসল্লি। এছাড়া ময়দানের আশপাশের হোটেল বাসাবাড়িতে ভাড়া নিয়ে অবস্থান নিচ্ছেন। তবে মাঠের ভেতরে নির্ধারিত খিত্তায় স্থান সংকুলন হওয়া কয়েক লাখ মুসল্লি ফিরে গিয়েছেন।
ভিআইপিদের অংশ গ্রহণ: ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. জাহিদ আহসান রাসেল, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র জাহাঙ্গীর আলম, গাজীপুরের জেলা প্রশাসক তরিকুল ইসলাম, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আনোয়ার হোসেন ুপ্রমুখ ময়দানে জুমার জামাতে অংশ নেন।
প্রথম দিনে যারা বয়ান করলেন : বাদ ফজর পাকিস্তানের মাওলানা খোরশেদ আম বয়ান করেন। তা বাংলায় ভাষান্তর করেন বাংলাদেশের মাওলানা আব্দুল মতিন। বাদ জুমা বয়ান করেন সৌদি আরবের মাওলানা শেখ ইউনুস, বাংলায় তরজমা করেন মাওলানা জাকির। বাদ আসর বয়ান করেন পাকিস্তানের মাওলানা এহসান ও বাদ মাগরিব বয়ান করেন ভারতের মাওলানা আহম্মেদ লাট। মূল বয়ান আরবি ও উর্দুতে হলেও সঙ্গে সঙ্গেই তা অনুবাদ করা হচ্ছে বাংলা, ইংরেজি, আরবি, উর্দু, তামিল, মালয়, তুর্কি ও ফরাসিসহ ২৪ ভাষায়। এসব বয়ানে ইমান ও আমলের গুরুত্ব, মুসলমান হিসেবে করণীয় ও দ্বীনের পথে চলার প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়।
দ্বিতীয় দিনের বয়ান : দ্বিতীয় দিনে বাদ ফজর বয়ান করবেন ভারতের মাওলানা আব্দুর রহমান ,বাংলায় তর্জমা বাংলাদেশের মাওলানা আব্দুল মতিন,বাদ যোহর ভারতের মাওলানা ইসমাইল গোদরা ভাষান্তর করবেন নূরুল রহমান,বাদ আসর দিল্লির মাওলানা জোহাইরুল হাসান ও বাদ মাগরিব ভারতের মাওলানা ইব্রাহিম দেওলা বয়ান করবেন।
জুমার জামাতের পূর্বে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য নামাজের মিম্বর থেকে খাস বয়ান, ওলামা হজরতদের জন্য খাস বয়ান, শিক্ষকদের জন্য বয়ানের মিম্বার থেকে খুসুসি বয়ান ও বধিরদের জন্য পৃথকভাবে বয়ান করা হয়। তবে এ বয়ান মাইকে দেওয়া হয়নি।
মুসল্লির মৃত্যু : ইজতেমায় আগত আরো তিন মুসল্লির মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মোট চার মুসল্লির মৃত্যুর সংবাদ পাওযা গেছে। শুক্রবার সকালে আরো তিন মুসল্লির মৃত্যু হয়। তারা হলেন সিরাজগঞ্জ জেলার কাজীপুর থানার পাটগ্রামের মৃত আমির শেখের ছেলে খোকা মিয়া(৬০),চট্রগ্রাম জেলার পটিয়া থানার খৈইলগ্রামের মোহাম্মদ আলী(৬৫),নওগা জেলরার আত্রাই থানার পাইকার বড়বাড়ি গ্রামের সোলেমান মিয়ার ছেলে শহিদুল ইসলাম(৫৫) মৃত্যু হয়েছে। এর আগে বৃহস্পতিবার গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া থানার লক্ষীরপাড় গ্রামের মৃত হাসেম আলীর ছেলে ইয়াকুব শিকদারের(৭৫) মৃত্যু হয়।
 রাস্তা বন্ধ : পর্ব ঘোষিত না থাকলেও শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে ময়মনসিংহ থেকে আগত মুসল্লিরা ভোগড়া চৌরাস্তায় নেমে হেঁটে ময়দানে আসতে হয়েছে। এদিকে সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক হয়ে আসা মুসল্লিরা মীরের বাজার নেমে যান এবং ঢাকা থেকে আসা মুসল্লিরা টঙ্গী ব্রিজে নেমে ইজতেমা ময়দানে আসেন। এ ছাড়া পশ্চিম-দক্ষিণবঙ্গ থেকে আসা মুসল্লিরা কামরাপাড়া ব্রিজে নেমে ইজতেমা ময়দানে প্রবেশ করছেন। তবে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক-মহাসড়কে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। শুক্রবার গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আনোযার হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
যৌতুক বিহিন বিয়ে: ইজতেমায় গতবারের ন্যায় এবারও হচ্ছেনা যৌতুক বিহীন বিয়ে। তবে যৌতুক বিহীন বিয়ে পূনরায় চালুর বিষয়ে কোন সিন্ধান্ত গ্রহণ করা হয় নি বলে জানিয়েছেন ইজতেমা আয়োজক কমিটির মুরব্বি জহির ইবনে মুসলিম।
নামাজে নারীর অংশ গ্রহন: ইজতেমায় পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও জুমার নামাজ আদায় করেন। ময়দানের আশপাশের দালানের ছাদে অসংখ নারীদের নামাজ আদায় করতে দেখা যায়।
হকার ও পকেটমার গ্রেফতার : ময়দানের চারপাশের রাস্তায় ভিক্ষুকের কারণে ময়দানে আসা দেশি-বিদেশি মুসল্লিদের চলাচলে বিব্রত হতে হচ্ছে। ময়দানের ভেতরে হকারদের উৎপাতও ভালোই ভোগাচ্ছে মুসল্লিদের। এছাড়া পকেটমারের দৌরাত্ব নেহায়েত কম নয়। বিভিন্ন অপরাধে শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত  ১৫০জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন টঙ্গী পূর্ব থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) মো.কামাল হোসেন।
ময়দানে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী : শেখ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন দু’পক্ষের শীর্ষ মুরব্বিরাই করেছেন। ইজতেমায় যে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে।
এছাড়া যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. জাহিদ আহসান রাসেল, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র জাহাঙ্গীর আলম, গাজীপুরের জেলা প্রশাসক তরিকুল ইসলাম প্রমুখ ময়দানে জুমার জামাতে অংশ নেন।
বিদেশী মেহমান: প্রতিবছরের মতো এবারও ইজতেমা ময়দানে শতাধিক দেশের বিদেশি মুসল্লিরা বিদেশি খিত্তায় অবস্থান করছেন। ইজতেমা আয়োজক কমিটির মুরব্বি মাওলানা শাহরিয়ার মাহমুদ জানান,  শুক্রবার সন্ধা পর্যন্ত বিশ্বের অন্তত ৭০টি দেশের প্রায় ২ হাজার বিদেশি মেহমান এসেছেন।
তীব্র যানজট: ইজতেমাকে ঘিরে ঢাকা –ময়মনসিংহ,টঙ্গী-সিলেট,আব্দুল্লাহপুর-আশুলিয়া সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন ময়দানে আগত লাখো মুসল্লি। তবে যানজাট স্বাভাবিক করতে হিমসিম খেতে হয় ট্রাফিক বিভাগকে।
গণমাধ্যমের অনুমোতি: ইজতেমায় গণমাধ্যম কর্মীদের সংবাদ সংগ্রহে ময়দানের ভেতরে অনুমোতি দিয়েছে আলমী শূরার সদস্যরা। এছাড়া ময়দানের ভেতরে ক্যামেরা প্রবেশে কোন বাধা দেওয়া হয় নি।
হেলিকপ্টার ও ড্রোন:  ছয় স্তরের নিরাপত্তার পাশাপাশি র‌্যাবের দুটি হেলিকপ্টার ও ড্রোনের মাধ্যমে আকাশ পথে টহল অব্যাহত রয়েছে।
দ্রব্য মূল্যে বৃদ্ধি : ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের ঘিরে টঙ্গীর ও তার আশপাশের এলাকা গুলোতে বসেছে অস্থায়ী বাজার। এসব বাজারে কাঁচা শাক-সবাজ,মাছ-মাংস,ডিমসহ প্রায় সকল পন্যেই কেজি প্রতি ২০-৩০ টাকা বেশিতে বিক্রয় করা হচ্ছে। এ বিষয়ে গাজীপুর জেলা অতিরিক্ত ম্যাজিষ্টেট শাহিনুল ইসলাম জানান, বাজার গুলোতে দুটি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে।
রোববার বেলা ১১টার মধ্যেই কাকরাইল মসজিদের পেশ ইমাম মাওলানা জুবায়ের আহম্মেদ আখেরী মোনাজাত করবেন বলে নিশ্চিত করেছেন আলমী শুরার মুরব্বি মাওলানা শাহরিয়ার মাহমুদ।