শিশুশ্রমে তৈরি হচ্ছে শিশুদের বই

আপডেটঃ ৯:৩৫ পূর্বাহ্ণ | জানুয়ারি ০৩, ২০২০

সি এন এ নিউজ,ডেস্ক:এসেছে নতুন বছর। প্রেসগুলো ব্যস্ত নতুন বই তৈরির কাজে। বইগুলো মূলত তৈরি হচ্ছে প্রথম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য। বিশেষ করে নোট, গাইড বই তৈরি এবং বিক্রির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে বেসরকারি প্রকাশনাসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। এসব বই তৈরির কাজে নিয়োজিত রয়েছে অনেক শিশু।

প্রেসে কাগজের যোগান দেয়া, প্রেস চালনা করা, বই বাঁধাই করাসহ বিভিন্ন কাজে শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে। অর্থাৎ শিশুশ্রম দ্বারা তৈরি হচ্ছে শিশুদের বই। অথচ যারা বই তৈরির কাজ করছে তারা বঞ্চিত হচ্ছে লেখাপড়ার সুযোগ থেকে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর বাংলাবাজার, প্যারিদাস লেন, হেমেন্দ্রদাস লেন, তনুগঞ্জ লেন, শিরিশদাস লেন, পাতলা খান লেনসহ যে সব এলাকায় প্রিন্টিং প্রেস রয়েছে সেখানে অধিকাংশ শ্রমিকের বয়স ১২ থেকে ১৫ বছর। যারা কৈশোর উত্তীর্ণ তারাও প্রেসে কাজ করছেন শিশুকাল থেকে। এদের অনেকে প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি পার করেনি। অনেকে স্কুলমুখী হওয়ার আগেই জীবিকার তাগিদে প্রেসে কাজ নিতে বাধ্য হয়েছে। সস্তা শ্রমে দিনে ১০-১২ ঘণ্টা তাদের কাজ করতে হচ্ছে।

বিশেষ করে বই বাঁধাইখানায় শিশু শ্রমিকের সংখ্যা বেশি। এসব শিশু শ্রমিকদের নামমাত্র বেতনে কাজ করিয়ে নিচ্ছে মালিক পক্ষ। ফলে ন্যায্য পাওনা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে শিশুরা। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বছরের শেষ এবং শুরুর দিকের এই সময়ে কেউ যদি অসুস্থ হয় তাহলেও ছুটি মেলে না। যে কারণে অনেকে কাজের চাপে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। কারণ কাজ ছাড়তে চাইলেও ছাড়া যায় না মালিকদের চাপে।

রাফি বুক বাঁধাই-এ কাজ করছে শিশুশ্রমিক রমজান। বাড়ি টাঙ্গাইল। দুই বছর সে এই প্রেসে কাজ করছে মাসিক ৩,৫০০ টাকা চুক্তিতে। ডিসেম্বর, জানুয়ারি মাসে তাকে ওভার টাইম করতে হয়। তখন তার মাসিক আয় হয়  ৫ হাজার টাকা। থাকার ব্যবস্থা মালিকের হলেও নিজের টাকায় খেতে হয়। এতে তার প্রতি মাসে ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা থাকে; যা পরিশ্রমের তুলনায় খুবই কম। আল মান্নান বুক বাইন্ডিং-এ দেখা গেল আরেক চিত্র। এখানে বাঁধাইয়ের কাজে কমর্রতদের ১০ জনের মধ্যে ৭ জনের বয়স ১২-এর নিচে।

নোয়াখালী থেকে আসা আব্দুল্লাহ ও তুহিন চাচাত ভাই। তাদের থাকা-খাওয়া মালিকের হলেও বেতন সাকুল্যে আড়াই হজার টাকা। এত বেশি শ্রম দিয়ে এত কম টাকা কেন? জানতে চাইলে আব্দুল্লাহ জানায়, কোনো উপায় নেই! কারণ তাদের কেউ কাজ দিবে না। কাজ না করলে খাবে কী? এক প্রকার বাধ্য হয়েই কাজ করতে হচ্ছে তাদের। মিনার বুক বাইন্ডিং-এ কাজ করছে হালিম। বয়স ৯ বছর। হালিম জানায়, তাকে প্রথম ৬ মাস শুধু পেটে-ভাতে কাজ করতে হয়েছে। কাজ শেখার পর থেকে সে থাকা-খাওয়া বাদে ১৫০০ টাকা বেতন পাচ্ছে।

মোকসেদ প্রিন্টিং-এ কাজ করছে সোহেল। বয়স দশ পেরোয়নি। সোহেল জানায়, সে এক বছরের বেশি সময় কাজ করলেও বেতন বাড়েনি। তার সবচেয়ে বড় দুঃখ- যে বই তারা তৈরি করে, সেই বই পড়তে পারে না। অথচ নতুন বইয়ের ঘ্রাণ তার ভালো লাগে। তার সহকর্মী আরমান অবশ্য এতটুকু বয়সেই বুঝে গেছে জীবনের বাস্তবতা। দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে সে জানায়, আমি পড়তে পারি না তাতে কী হয়েছে? যারা পড়বে তারা তো আমার মতোই ছোট!

কেন শিশুদের এভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে? জানতে চাইলে বাংলাদেশ বই পুস্তক বিক্রেতা সমিতির সভাপতি আরিফ হোসেন (ছোটন) বলেন, বাঁধাই প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা বারবার সতর্ক করেছি- শিশু শ্রমিকদের নিবেন না। নিলেও তাদের দিয়ে ভারী কাজ করাবেন না। আমরা খোঁজ নিয়ে দেখে যদি এমন পাই তবে তাদের বিরুদ্ধে সমিতির নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পুস্তক বাঁধাই সমিতির সভাপতি এম এ মল্লিক বলেন, আমরা চেষ্টা করছি বিষয়টি খতিয়ে দেখার। এমন হলে সমিতির পক্ষ থেকে তাদের লাইসেন্স বাতিল করার সুপারিশ করা হবে।

বাংলাদেশ শিশু একাডেমির মহাপরিচালক জ্যোতি লাল কুরী বলেন, শুধু বই বাঁধাই নয়, যারা বিভিন্ন কাজে শিশুদের ব্যবহার করে তাদের সচেতন করতে হবে। এ বিষয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগ অধিক ফলপ্রসু হবে বলে মনে করি।

সরকার জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী শিশু অধিকার সংরক্ষণ, শিশুর জীবন ও জীবিকা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ প্রদান, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচি পরিচালনাসহ শিশু নির্যাতন বন্ধ, বিশেষ করে কন্যা-শিশুদের বৈষম্য বিলোপ সাধনে বিভিন্ন প্রকল্প ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এর পাশাপাশি প্রণয়ন করা হয়েছে জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি-২০১০ ও জাতীয় শিশুনীতি-২০১১। এসব কর্মসূচি ও নীতিমালা শিশুর শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন রাখছে।

এ প্রসঙ্গে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী রওশন আক্তার বলেন, শিশুশ্রম হলো সামাজিক শোষণের দীর্ঘস্থায়ী হাতিয়ার। যে কোন দেশের শিশুশ্রম, সেই দেশ উন্নয়নে কতটা পিছিয়ে তার নির্দেশক হিসেবে ধরা হয়। তাই শিশু অধিকার নিশ্চিত ও শিশুশ্রম বন্ধ করতে আমাদের সবাইকে কাজ করতে হবে। এজন্য মিডিয়া, সুশীল সমাজ, শিক্ষাবিদসহ সমাজের সকল নাগরিকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। শিশুদের স্বার্থ রক্ষায় সকল আইন ও নীতিমালার বাস্তবসম্মত সমন্বয়, বাস্তবায়ন ও প্রয়োগ করা প্রয়োজন।