যে দ্বীপ শীতে যৌবন ফিরে পায়

আপডেটঃ ৮:৫৮ অপরাহ্ণ | ডিসেম্বর ১৯, ২০১৯

সি এন এ নিউজ,ডেস্ক:চারদিকে সাগরের অথৈ জলরাশি, এর মাঝখানে ছোট্ট দ্বীপটিকে দেখলে মনে হয়, শিল্পীর তুলিতে আঁকা কোনো এক দৃশ্য। কিন্তু না, এটি শিল্পীর কোনো আঁকা দৃশ্য নয়। এটি হচ্ছে চট্টগ্রাম জেলার দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপ।

বাংলাদেশের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের ঠিক মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে আছে অতি প্রাচীন এই দ্বীপটি। মেঘনা মোহনায় অবস্থিত এর চারপাশে রয়েছে বিশাল বিশাল জাহাজের আনাগোনা। নদী আর সমুদ্র যেন এই সন্দ্বীপকে অতি আদরে আগলে রেখেছে।

এখানে ভোর হলেই রাখাল তার গরু নিয়ে চলে যান দিগন্ত ভরা মাঠে। শীতের সকালে জেলেরা পুকুরের মাছ ধরতে চলে যান প্রতিটি গ্রামের বাড়িতে। যেখানে রোদ পোহাতে বাড়ির উঠানে জমে নানা-নানি, দাদা-দাদি এবং নাতি-নাতনিদের আড্ডার আসর। সূর্যি মামা উঁকি দিলে কৃষানিরা ধান মাড়াইতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। যেখানে সন্ধ্যা নামলেই বসে জোনাকির হাট। রাত নামলেই ডাব গাছে উঠে শৌখিন চোর।

যেখানে শিউলিতলায় ফুল কুড়াতে নামে শৈল্পিক কোনো ভুবন। বাড়িতে বাড়িতে গৃহিণীদের আচার বানানোর উৎসব পড়ে যায়। এখানে বড়ই গাছ দেখলে ঢিল ছুড়ে মারে গ্রামের কিশোর-কিশোরীরা। শীতের রাতে খেজুর রসের তৈরি পায়েসের আয়োজনে মুখর হয়ে উঠে প্রতিটি গ্রাম। শীত এলে যেন যৌবন ফিরে পায় এই সন্দ্বীপ।

প্রাকৃতিক অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি এই সন্দ্বীপ। এখানে রয়েছে সমুদ্র সৈকত, ফসল ভরা মাঠ, সবুজ প্রকৃতি, গ্রামীণ হাট-বাজার সব কিছুই। দ্বীপের উত্তর থেকে দক্ষিণের সব প্রান্ত ঘুরে দেখতে পারেন অনায়াসে। রয়েছে নদী, পুকুর, ও খাল-বিলে দেশীয় বিভিন্ন জাতের সুস্বাদু মাছের ছড়াছড়ি। এখানে গরু-মহিষের দুধ, দই ও খেজুরের রস পাওয়া যায়। রয়েছে নানারকম শাক-সবজি ফসলের ক্ষেত। অপূর্ব সবুজের বেষ্টনী দর্শনার্থীর মন কেড়ে নেয়।

সন্দ্বীপে শীতকালে অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠে পাড়া-মহল্লা। জেলেদের সাথে পাল্লা দিয়ে পাখিরাও মাছ শিকার করেন। দলবেঁধে পাখিদের উড়াউড়ি মন কেড়ে নেয়। একসাথে অবলোকন করা যায় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত।

হাজার বছরের ঐতিহ্য ঘেরা এ দ্বীপের অনেক কিছু হারিয়ে গেছে নদী গর্ভে। নদীর এ করালগ্রাসের পরও এখনো বেশ সমৃদ্ধির পসরা সাজিয়েছে সন্দ্বীপ। কেওড়া গাছ দিয়ে নির্মিত দেশের সর্ববৃহৎ কাঠের সেতু, দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ সোলার প্যানেল পূরবী, ইসলাম সাহেবের বিশাল খামারবাড়ি, ম্যানগ্রোভের দৃষ্টিনন্দন বেষ্টনী, গুপ্তছড়া ঘাটের বিশাল জেটি, রাস্তাসহ সবুজের অসংখ্য পটে আঁকা দৃশ্য। দৃষ্টি জুড়ে সবুজ আর সবুজ।

উত্তরে দেখতে পারেন তাজমহলের আদলে নির্মিত শত বছরের পুরনো মরিয়ম বিবি সাহেবানী মসজিদ। শত বছরের পুরনো জমিদার বাড়ি। দ্বীপের দক্ষিণে আছে ঐতিহ্যবাহী শুকনা দিঘী, অসংখ্য বড় বড় খেলার মাঠ। দেখতে পারবেন, বাউল গানের আসর। সাঁতার কাটতে পারেন দ্বীপের স্বচ্ছ পানির পুকুরে। ঘুরে আসতে পারেন উত্তরের বিশাল সবুজ চর দক্ষিণের কালিয়ার চর থেকে। যেখানে গেলে মুহূর্তে আপনাকে এনে দিবে অন্যরকম এক প্রশান্তি।

আরও ঘুরে আসতে পারেন পশ্চিমে সারি সারি নারকেল গাছ দিয়ে আচ্ছাদিত মেঘনা নদীর পাড়, যেখানে চোখ ফিরালেই দেখা যাবে সমান ঘাসের মাঝে মাঝে নারিকেলগাছের কী দারুণ সুন্দর একটা সৈকত। প্রতিটি গাছই যেন একেকটা ওয়ালপেপার, হুট করে দেখলে মনে হবে দূরদেশের কোনো এক আয়েশি সৈকত অপেক্ষায় আছে অতিথিদের।

এটি দ্বীপ হলেও নিত্য প্রয়োজনীয় সমস্ত খাবার অতি সহজে পাওয়া যায় এখানে। সামুদ্রিক মাছ, মাংস থেকে শুরু করে পিঠা সব কিছু পাবেন। আর এই শীতের মৌসুমে মিলবে সবচেয়ে সুস্বাদু খেজুরের রসের পায়েস। পাবেন দ্বীপের বিখ্যাত চিতল পিঠা, যা আপনি খেতে পারেন শীতকালীন মিঠাই দিয়ে। এছাড়া দ্বীপের বিখ্যাত বিনয় সাহার মিষ্টি খেয়ে নিতে পারেন। সেজন্য আপনাকে দ্বীপের দক্ষিণে শিবের হাট পর্যন্ত যেতে হবে।

রূপে মুগ্ধ হয়ে যুগে যুগে অনেক কবি সাহিত্যিক ঐতিহাসিক পর্যটক এসেছেন এখানে। ১৩৪৫ সালে পর্যটক ইবনে বতুতা সন্দ্বীপ আসেন। ১৫৬৫ সালে ড্যানিশ পর্যটক সিজার ফ্রেডরিক সন্দ্বীপে আসেন এবং এর বহু প্রাচীন নিদর্শনের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেন। ১৯২৯ সালের ২৮ জানুয়ারি মোজাফ্ফর আহম্মদের সাথে সন্দ্বীপে আসেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

যাতায়াত

দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে চট্টগ্রামগামী বাসে উঠে চলে যাবেন কুমিরা। তারপর অটো ধরে ৫ মিনিটে কুমিরা ঘাটে এসে স্পিডবোট, কিংবা অন্য কোনো নৌযান দিয়ে পাড়ি দিবেন সন্দ্বীপ চ্যানেল। সন্দ্বীপ ঘাটে আসার পর মোটরসাইকেল দিয়ে চলে যাবেন আপনার গন্তব্যস্থলে।

থাকা ও খাওয়া

সন্দ্বীপ শহরে বেশ কিছু ভালো মানের হোটেল রয়েছে। তাছাড়া সন্দ্বীপের খাবারের হোটেল গুলোর মান বেশ স্বাস্থ্যকর ও সাশ্রয়ী।

সব দিক থেকে শীতকালীন ভ্রমণের উপযুক্ত স্থান ৩ হাজার বছরের পুরনো সন্দ্বীপ। অতিথিপরায়ণের দিক থেকে এ দ্বীপের আলাদা খ্যাতি রয়েছে। দ্বীপে পা রাখলে যে কেউ আপনাকে বরণ করে নিতে বাধ্য।

বর্তমানে দলবেঁধে ক্যাম্পেইন করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন পর্যটকরা। সৈকতে ক্যাম্পিং করে নিরিবিলি রাত কাটাতে চাইলে এর থেকে ভালো জায়গা খুব কমই আছে। তাই চাইলে এই শীতে আপনিও ঘুরে আসতে পারেন প্রাকৃতিক অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি সন্দ্বীপ থেকে।