১৬ বছর অন্ধকারে সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলা

আপডেটঃ ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ | নভেম্বর ০৫, ২০১৯

বিনোদন ডেস্ক:৯০ দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী। মিষ্টি হাসি আর মায়াবী মুখচ্ছবির জন্য তাকে বলা হতো বাংলা চলচ্চিত্রের চির সবুজ নায়ক।

কয়েকটি ছবিও তার সুপার-ডুপার হিট হয়। তখনকার বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম সফল চিত্র নায়িকা ছিলেন দিতি। সোহেল চৌধুরী ও দিতি জুটিবদ্ধ হয়ে অভিনয় করতে গিয়েই একে অন্যকে ভালবাসেন। একপর্যায়ে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

সুখের সংসারে জন্ম নেয় দুই সন্তান। সংসারের প্রয়োজনে সোহেল চৌধুরী অভিনয় কমিয়ে দিলেও দিতি ছিলেন বিপরীত। চারিদিকে দিতির সুনাম ও খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ায় তিনি সংসার থেকে অভিনয়কে বেশি প্রাধান্য দেন। মূলত এ কারণে সোহেল চৌধুরীর সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব শুরু হয়। বিভিন্ন পরিচালক, প্রযোজক সোহেল চৌধুরীর শত্রুতে পরিণত হন। আর এ শত্রুতায় সোহেল চৌধুরীর জীবনের নির্মম পরিণতির কারণ ।

জানা যায়, স্ত্রী দিতির অবহেলা আর চলচ্চিত্রে নিজের অবস্থান নড়-বড়ে হয়ে যাওয়ায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন সোহেল চৌধুরী। তিনি জড়িয়ে পড়েন নেশার জগতে। একপর্যায়ে বিভিন্ন ক্লাবপাড়া তার ঠিকানায় পরিণত হয়। সেখানে নেশা ও জুয়ায় মজে থাকতেন তিনি। আর সেখানেই অপরাধ জগতের গড ফাদারদের সাথে তার দ্বন্দ্ব শুরু হয়।

দ্বন্দ্বের শেষটা তাকে জীবন দিয়েই মেটাতে হয়েছে। মৃত্যুর ২১ বছর পরও স্বজনরা সোহেল চৌধুরী হত্যার বিচার পায়নি। নিম্ন আদালতে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হলেও ১৬ বছর মামলাটিতে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের কারণে তা আর আলোর মুখ দেখেনি।

সংশ্লিষ্টরা জানান সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলাটি প্রভাবশালীদের কারণেই আটকে আছে।

১৯৯৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর বনানীর ১৭ নম্বর রোডের আবেদীন টাওয়ারে ট্রাম্পস ক্লাবের নীচে নায়ক সোহেল চৌধুরীকে গুলিতে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।

ঘটনার দিনই নিহতের ভাই তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী গুলশান থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে শুধু আদনান সিদ্দিকীকে আসামি করা হয়।

১৯৯৯ সালের ৩০ জুলাই ডিবি পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার আবুল কাশেম ব্যাপারী এজাহারনামায় আসামি আদনান সিদ্দিকীসহ নয়জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন।

চার্জশিটের অপর আসামিরা হলেন, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই ওরফে আব্দুল আজিজ, টমার্স ক্লাবের মালিক আফাকুল ইসলাম ওরফে বান্টি ইসলাম, তারিক সাঈদ মামুন, সেলিম খান, হারুন অর রশীদ ওরফে লেদার লিটন ওরফে বস লিটন, ফারুক আব্বাসী, আশিষ রায় চৌধুরী ওরফে বোতল চৌধুরী ও শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন।

আসামিদের মধ্যে ইমন কারাগারে এবং বোতল চৌধুরী পলাতক ও আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ সাত আসামি জামিনে।

২০০১ সালের ৩০ অক্টোবর ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেন। এরপর ২০০৩ সালের মামলাটি বিচারে দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ঢাকার দুই নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়।

কিন্তু আসামিদের মধ্যে একজন হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন দাখিল করেন। ওই রিট আবেদনে হাইকোর্ট বিভাগের তৎকালীন বিচারপতি এম.এ মতিন ও সৈয়দ রিফাত আহমদের বেঞ্চ ২০০৩ সালের ১৯ নভেম্বর প্রথমে তিন মাসের জন্য নিম্ন আদালতে মামলাটির কার্যক্রম স্থগিত করেন।

পরে ২০০৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি রিটের রুলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মামলাটির নিম্ন আদালতের কার্যক্রম স্থগিত করেন। কিন্তু গত ১৬ বছরে ওই রুলের নিষ্পত্তি না হওয়ায় নিম্ন আদালতে বিচার কার্যক্রম শুরু করা যায়নি। আলোচিত মামলার নথি ঢাকার দুই নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে আলমারি বন্ধ।

নায়িকা দিতি ২০১৬ সালের ২০ মার্চ মারা যান। মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত দিতি মামলার বিষয়ে খোঁজ খবর নিতেন। জানা যায়, তাদের দুই সন্তান দেশের বাইরে থাকেন। একারণে তারা বাবা হত্যার বিচারের জন্য ততটা তৎপর না।

মামলা সম্পর্কে আদালতের এক কর্মকর্তা বলেন, ২০০৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি রিটের রুলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত পাওয়ার পর ট্রাইব্যুনালে এ মামলার বিচার কার্যক্রম বন্ধ রেখেছেন। স্থগিতাদেশের জন্য আসামিদের হাজিরাও দিতে হয় না।

মামলা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর সৈয়দ শামছুল হক বাদল বলেন, ‘মামলাটির চার্জ গঠনের পর এক আসামির পক্ষে হাইকোর্ট মামলার কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। এজন্য মামলার কার্যক্রম স্থগিত প্রায় ১৬ বছর। এতদিন একটি মামলা স্থগিত থাকলে পরবর্তীতে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হয়ে আসলেও মামলার অভিযোগ প্রমাণ করতে অসুবিধা হয়। কারণ সাক্ষী মারা যেতে পারে, আলামত নষ্ট হয়ে যেতে পারে এবং সাক্ষীদেরও ঠিকানায় নাও পাওয়া যেতে পারে। তাই যতো দ্রুত সম্ভব স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হওয়া প্রয়োজন। এ ব্যাপারে এ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া উচিত।’

বনানী জামে মসজিদের পাশে আবেদীন টাওয়ারের অষ্টম তলায় বান্টি ইসলাম ও বোতল চৌধুরী মালিকানাধীন টমার্স ক্লাব অবস্থিত। ওই ক্লাবে অসামাজিক কার্যকলাপ হতো। বিশেষ করে নিয়মিত মদ্যপান, মহিলাদের অশ্লীল নৃত্য চলতো। ক্লাবের এ ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপের বিরোধিতা করেছিলেন সোহেল চৌধুরী। সোহেল চৌধুরী বনানীর মসজিদ কমিটির লোকজন নিয়ে এ ধরনের অসামাজিক কাজ বন্ধের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়।

১৯৯৮ সালের ২৪ জুলাই ক্লাবের মধ্যে এক বান্ধবী নিয়ে সোহেল চৌধুরীর সাথে আজিজ মোহাম্মদের সঙ্গে তর্ক হয়। উত্তেজিত হয়ে নায়ক সোহেল চৌধুরী আজিজ ভাইকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। সেদিন আজিজ মোহাম্মদ ভাইকে হত্যার চেষ্টাও চালায় সোহেল চৌধুরী।

এ দুটি ঘটনার পর আসামিরা সোহেলকে হত্যার পরিকল্পনা  করে। হত্যার দিন সোহেল রাত একটার দিকে বন্ধুদের নিয়ে টমার্স ক্লাবে ঢোকার চেষ্টা করেন। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) তোফাজ্জল হোসেন তাকে ঢুকতে না দেওয়ায় তখন তিনি চলে যান। সেদিন রাত আড়াইটার পর সোহেল ফের ক্লাবে ঢোকার চেষ্টা করলে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন, মামুন, লিটন, ফারুক আব্বাস ও আদনান সিদ্দিকী সোহেলকে লক্ষ্য করে গুলি চালালে ঘটনাস্থালে তিনি মারা যান। খুনের পরপরই খুনি আদনান সিদ্দিকী হাতেনাতে ধরা পড়ে।

প্রসঙ্গত, বাংলা চলচ্চিত্রের অমর নায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর মামলায়ও প্রধান আসামি বিতর্কিত ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই। এই আজিজ মোহাম্মদ ভাই অপরাধ জগতের সম্রাট হিসেবে পরিচিত।

এমন অপকর্ম নেই যিনি তার সাথে জড়িত নন। আর এসব কিছু বাড়িতে বসেই করতেন তিনি। যার প্রমাণ মিলেছে সম্প্রতি। দেশে চলমান ক্যাসিনো বিরোধী অভিযানে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর অভিযান চালাতে গিয়ে হতবাক হয়ে যান। কর্মকর্তারা আজিজ মোহাম্মদ ভাই  এর বাড়ি গিয়ে দেখেন, সেটা আসলে বাড়ি নয় যেন মদের বার, জুয়ার জলসা ঘর।