জুয়াড়িকে সাকিব, ‘আগে দেখা করতে চাই’

আপডেটঃ ৯:৩০ পূর্বাহ্ণ | অক্টোবর ৩০, ২০১৯

সি এন এ নিউজ,ডেস্ক:হুট করে সব এলোমেলো হয়ে গেল। সাজানো সংসার ভেঙে গেল এক ঝাটকায়। বনানীতে যে বাসায় সাকিব থাকেন আশেপাশের মানুষরাও জানতেন না বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার তাদের প্রতিবেশী!

মঙ্গলবার এক ডজন টিভির গাড়ী ও সংবাদকর্মীদের দেখে তাদের জানতে আগ্রহ, ‘ওই বাসায় কে থাকেন?’ শত ভীড়ের মাঝে সাকিব নিজেকে এতোটাই আড়ালে রেখেছেন যে ভুলেও গেছেন তার দ্বারা ভুল করা সম্ভব! নয়তো এমন ‘ভুল’ কিভাবে করেন? ২০১০ এবং ২০১৩ সালে জুয়াড়ির কাছ থেকে ম্যাচ গড়াপেটার প্রস্তাব পেয়েছিলেন সাকিব। সঙ্গে সঙ্গে জানিয়েছিলেন দুর্নীতি দমন বিভাগকে। অথচ সিনিয়র সাকিব শেষ দুই বছরে দীপক আগারওয়াল নামক এক জুয়াড়ির থেকে তিনবার ম্যাচ পাতানো এবং স্পট ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব পেয়েও জানাননি কাউকে।

তথ্য গোপন করার অপরাধে আইসিসি তাকে এক বছরের স্থগিত নিষেধাজ্ঞাসহ দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু সত্যিই কি সাকিব ভুলে গিয়েছিলেন? আইসিসির দেওয়া প্রমাণ সাকিবের পক্ষে বলছে না। বরং সন্দেহ বাড়াচ্ছে। আইসিসি স্পষ্ট করে জানিয়েছে, দীপক আগারওয়ালের সঙ্গে নিয়মিত কথা চালিয়ে গেছেন সাকিব। কিছু বার্তা সাকিব ডিলিট করেছেন,  আইসিসির জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন। শুধু তাই নয়, ওই জুয়াড়ির সঙ্গে দেখা করার আগ্রহও প্রকাশ করেছিলেন সাকিব।

চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি এবং ২৭ অগাস্ট বাংলাদেশে সাকিবের সাক্ষাৎকার নেয় আইসিসির দুর্নীতি বিরোধী ইউনিট। আকসু সাকিবকে পুরো ঘটনা গোপন করার কথা বলেছিলেন। সাকিবও বিষয়টি গোপন রাখেন। এ মাসের শুরুতে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন আইসিসির মিটিংয়ে সাকিবের এ ইস্যুটি জানতে পারেন।  আইসিসি তাকে অনুরোধ করে বিষয়টি গণমাধ্যমে না আনতে।

গতকাল আইসিসির সংবাদ বিজ্ঞপ্তির পর সাকিবের ইস্যুতে মুখ খুলেন বোর্ড প্রধান। সাকিব সাক্ষাৎকারের শুরু থেকেই আকসুকে সর্বাত্মক সহায়তা করেন। শুরু থেকেই স্বীকার করেন দীপক আগারওয়ালের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়েছিল। তাদের প্রথম যোগাযোগ হয় ২০১৭ সালের বিপিএলে। মাঝে দুটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ এবং সবশেষ আইপিএলে তার সঙ্গে যোগাযোগ হয় আগারওয়ালের।

২০১৭ সালের বিপিএল চলাকালিন সাকিবের ফোন নম্বর পান আগারওয়াল।  নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে সাকিবের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা আদান-প্রদান হয় আগারওয়ালের। আগারওয়াল বিপিএলের সময়ই সাকিবের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন।  এ ঘটনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাননি সাকিব। অথচ বিপিএলে সবগুলো দলের সঙ্গে একজন করে আকসুর কর্মকর্তা কাজ করেন।

খুবই অল্প সময়ের ব্যবধানে দুজনের আবার যোগাযোগ হয় হোয়াটসঅ্যাপে। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে শ্রীলঙ্কা ও জিম্বাবুয়ে সিরিজে তাদের বার্তা আদান প্রদান হয়।  ১৯ জানুয়ারির ম্যাচে সাকিব ম্যান অব দ্য ম্যাচ নির্বাচিত হওয়ার পর জুয়াড়ি সাকিবকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘আমরা কি এটাতে ‘‘ওয়ার্ক’’ করব, নাকি আইপিএল পর্যন্ত অপেক্ষা করব।’ আইসিসি বলছে, এখানে ‘ওয়ার্ক’ বলতে সাকিবের কাছ থেকে দলের ভেতরের তথ্য জানার কথা বোঝাতে চেয়েছেন আগারওয়াল।
ঠিক চারদিন পর আগারওয়াল আবার বার্তা দেন সাকিবকে। আবারও অভ্যন্তরীণ তথ্য সরবরাহের প্রস্তাব দিয়ে বলেন, ‘ব্রো, এই সিরিজে কিছু হবে?’ সাকিব নিজের জবানবন্দীতে বিষয়টি স্বীকার করে জানান, দলের ভেতরের খবর জানতে আগারওয়াল প্রস্তাব দিয়েছিলেন তাকে।

বিপিএল, আন্তর্জাতিক ম্যাচের পর আগারওয়ালের সঙ্গে সাকিবের কথা হয় আইপিএল চলাকলিন। ২০১৮ সালের ২৬ এপ্রিল আইপিএলের ম্যাচে অংশ নেন সাকিব। তার দল ছিল সানরাইজার্স হায়দরাবাদ। প্রতিপক্ষ ছিল কিং ইলাভেন পাঞ্জাব। ওই ম্যাচের আগে আগারওয়াল একজন নির্দিষ্ট খেলোয়াড় খেলবেন কিনা জানতে চান সাকিবের কাছে।  ওই আলোচনা চালিয়ে যান দুজন এবং আগারওয়াল তাদের আলোচনা এক ধাপ এগিয়ে নেন। বিটকয়েন, ডলার অ্যাকাউন্ট এবং সাকিবের ডলার অ্যাকাউন্টের ব্যাপারে জানতে চান। এ আলোচনার সময়ই সাকিব বলেন, ‘‘আগে’ দেখা করতে চাই।’

সেদিনের দুজনের কথোপকথনের বেশ কিছু বার্তা ডিলিট করেন সাকিব। সাকিব আইসিসির কাছে স্বীকার করেন ওই সময়ও আগারওয়াল তার কাছে তথ্য জানতে চেয়েছিলেন পাশাপাশি সাকিব এও জানান সেবারই প্রথম আগারওয়ালকে জুয়াড়ি হিসেবে সন্দেহ হয় তার। জুয়াড়ি হিসেবে আগারওয়ালকে সন্দেহ হলেও সাকিব আকসুকে জানায়নি।

জুয়াড়ির সঙ্গে নিয়মিত বার্তা আদান প্রদান হওয়ার পর একটা সময় সাকিবের দেখা করতে চাওয়ার আগ্রহ ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিত করছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে সাকিব স্বীকার করেছেন আগারওয়ালের কোনো প্রস্তাব তিনি গ্রহণ করেননি এবং তার কথা মতো কোনো কাজও করেননি। মিরপুরে গুঞ্জন রয়েছে, ম্যাচ গড়াপেটা নিয়ে প্রস্তাব পেয়েছিলেন তামিম ও মুশফিকও।প্রস্তাব পাওয়ার পর তারা আকসুকে বিষয়টি জানিয়েছিল। আইসিসি সেই দুই ক্রিকেটারকে নিয়েও তদন্ত করেছিল কিন্তু তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা পায়নি।

সাকিবের ইস্যুটি আইসিসির চোখে ভিন্ন। সাকিবকে তিনবার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, কোনোবারই সাকিব সেকথা আইসিসিকে জানাননি। আইসিসির দাবি, এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।