বড় হারের লজ্জায় শেষ অনেক আশার বিশ্বকাপ

আপডেটঃ ৯:৫১ পূর্বাহ্ণ | জুলাই ০৬, ২০১৯

ক্রীড়া ডেস্ক :মন্ত্র ছিল একটাই, লর্ডসে সাকিবকে থামাও ম্যাচ জিতে নাও।’

শাহীন শাহ আফ্রিদি ৯২’র চ্যাম্পিয়নদের হয়ে কাজটা করে দিয়েছিলেন ইনিংসের ৩৩তম ওভারে। পাকিস্তানের দেওয়া ৩১৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশ তখন ১৬১ রানে পিছিয়ে।  সাকিব বিশ্বকাপে আরেকটি হাফ সেঞ্চুরি তুলে ৬৪ রানে আউট।  পরের ব্যাটসম্যানরা পরাজয়ের ব্যবধান কমিয়েছেন মাত্র। আগের ব্যাটসম্যানরা ব্যর্থতার বৃত্তে বন্দী। ৯৪ রানের বিশাল হার নিয়ে বাংলাদেশ শেষ করল বিশ্বকাপের মিশন। অনেক আশার বিশ্বকাপ শেষ হল বড় হারের লজ্জা দিয়ে।
ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশ কি নিয়ে ফিরবে তা নির্ধারিত হতো লর্ডসের এ ম্যাচে। বলা হচ্ছিল, শেষ ভালো যার সব ভালো তার। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ভালো শুরু করেও নিজেদের ষষ্ঠ বিশ্বকাপের মিশন বাংলাদেশ শেষ করল হতাশায়। পাকিস্তানের বিপক্ষে বিশাল হার দিয়ে বিশ্বকাপের ব্যর্থতার বৃত্ত পূরণ করল মাশরাফি ব্রিগেড।

৯৯’র বিশ্বকাপ থেকে ২০১৯ বিশ্বকাপ পর্যন্ত বাংলাদেশের পাল্টেনি কোনো কিছুই।  এখনও তিন জয়ের বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে দল।  এবারও পেয়েছে তিন জয়।  প্রোটিয়াদের হারানোর পর ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও আফগানিস্তানের বিপক্ষে পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ক্রিকেটের বড় চার দল অস্ট্রেলিয়া, ভারত, ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ড; তাদের কাউকেই হারাতে পারেনি টাইগাররা। এজন্য ইংল্যান্ড বিশ্বকাপকে বাংলাদেশের ব্যর্থতার বিশ্বকাপ বললেও ভুল হবে না।

লর্ডসে বাংলাদেশের প্রথম ওয়ানডে। খেলোয়াড়রা পেলেন গার্ড অব অনার। স্থানীয় দুই স্কুলের প্রায় ৫০ শিক্ষার্থী প্যাভিয়িনের ভেতরে সাকিব, মাশরাফিদের স্বাগত জানান।  নয়নাভিরাম বিশাল ব্যালকনিকে পেছনে রেখে ম্যাচের আগে চলে গ্রুপ ফটোসেশন। সেখানেই প্রথম দেখা যায় মাশরাফিকে।  তার ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ।  এরপর নামলেন টস করতে।  টসের সময়ও বললেন, এটাই শেষ ওয়ার্ল্ডকাপ গেম।’

ম্যাচের ব্যবধান গড়ে দিয়েছেন পাকিস্তানের ওপেনার ইমাম-উল-হক, বাবর আজম আর শাহীন শাহ আফ্রিদি।  ইমাম ও আফ্রিদি ভাগ্যবান।  লর্ডসের অনার্স বোর্ডে নাম তুলেছেন সেঞ্চুরি ও ছয় উইকেট নিয়ে। পাকিস্তানের ইনিংস মেরামত করা বাবর আজম মাত্র ৪ রানের জন্য পাননি লর্ডসে সেঞ্চুরির স্বাদ, সেটাও বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে! ভাগ্যবান মুস্তাফিজুর রহমানও।  নিজের পঞ্চম ও  টানা দ্বিতীয়বারের মতো পাঁচ উইকেট পেলেন।  বাংলাদেশের তৃতীয় খেলোয়াড় হিসেবে নাম তুললেন গৌরবের অনার্স বোর্ডে।

সেঞ্চুরিয়ান ইমামের শতরানের ইনিংসটি কাটা পড়ে মুস্তাফিজের বলে হিট উইকেটে। বাবর ৯৬ রানে এলবিডব্লিউ হন সাইফউদ্দিনের ইয়র্কারে। সেঞ্চুরিয়ান ইমাম ও হাফ সেঞ্চুরিয়ান বাবরকে ফেরালেও বাংলাদেশ শেষ দিকে পুড়েছে ইমাদ ওয়াসিমের ব্যাটে।  বাঁহাতি স্পিন অলরাউন্ডার ২৬ বলে ৬ চার ও ১ ছক্কায় করেন ৪৩ রান।

ভারত আগেরদিন টার্গেট দিয়েছিল ৩১৫। পাকিস্তান গতকাল দিয়েছিল এক রান বেশি। কিন্তু ব্যাটিং ব্যর্থতায় বিশাল পরাজয় বরণ করে বাংলাদেশ। ক্রিকেট মাঠে সুযোগ আসলে তা কিভাবে কাজে লাগাতে হয় তা করে দেখিয়েছেন বাবর আজম।  পয়েন্টে ৫৮ রানে মোসাদ্দেকের হাতে এবং ৬৫ রানে মুশফিকের হাতে জীবন পাওয়ার পরও দিব্যি ব্যাটিং করে গেছেন। সেখানে সৌম্য ৬ রানে জীবন পাওয়ার পর ইনিংস বড় করতে ভুলে যান।  তামিম ৩ রানে উইকেটের পেছনে খোঁচা দিয়েও বেঁচে যান। কিন্তু ইনিংস বড় করতে পারেন না কেউ।

ওপেনারদের ব্যাটিং ব্যর্থতার দিনে মুশফিক, লিটনও দ্যুতি ছড়াতে পারেননি।  উইকেটে থিতু হয়ে উইকেট উপহার দিয়েছেন।  সব খারাপের মধ্যে সাকিব ছিলেন ধ্রুপদী।  কেন তিনি বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার তা প্রমাণ করেছেন আরো একবার।  শাহীন শাহ আফ্রিদির বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেওয়ার আগে করেন ৬৪ রান।  নিজেকে নিয়ে গেছেন অন্য উচ্চতায়। এর আগে মাত্র দুজন ব্যাটসম্যান বিশ্বকাপের এক আসরে ছয়শ বা এর বেশি রান করেছেন।  সাকিব তৃতীয় খেলোয়াড় হিসেবে যোগ দেন এলিট সেই ক্লাবে। ৮ ইনিংসে সাকিবের রান ৬০৬। ব্যাটিং গড় ৮৬.৫৭। স্ট্রাইক রেট ৯৬.০৩। দুই সেঞ্চুরির সঙ্গে হাফ সেঞ্চুরি পাঁচটি। এর আগে টেন্ডুলকার ৬৭৩, ম্যাথু হেইডেন ৬৫৯ রান করেছেন।

বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের নাকানিচুবানি খাইয়ে ছয় উইকেট পেয়েছেন শাহীন শাহ আফ্রিদি। বিশ্বকাপের সর্বোকনিষ্ঠতম ক্রিকেটার হিসেবে পাঁচ উইকেট পাওয়ার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন আকরাম, আামিরদের উত্তরসূরী।

নিজের বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচে ৭ ওভারে ৪৬ রান দিয়ে মাশরাফি ছিলেন উইকেটশূণ্য। তবে ভিন্নভাবে এ ম্যাচের কথা মাশরাফি মনে রাখতে পারেন।  তার ১৪ বলে ১৫ রানের ইনিংসে ছিল দুটি ছক্কা।  বাংলাদেশের ইনিংসেরও দুটি ছক্কা আসে তার ব্যাট থেকে।  ২০০৩ সালে তার বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু হয়েছিল। ২০১৯ এ এসে থামল।  এ সময়ে বিশ্বকাপে পেলেন ১৯ উইকেট।

চাওয়া-পাওয়ার পূর্ণতার মাঝে ব্যবধান গড়ে দেয় সামর্থ্য।  বিশ্বকাপে শেষ চারে যাওয়ার সব সামর্থ্য থাকলেও সাকিব বাদে কারোরই ছিল না লক্ষ্যে পৌঁছানের তীব্র ক্ষুধা। যদি থেকেই থাকত তাহলে ক্ষুধা নিবারণ করা যেত!  একমাত্র সাকিব একাই তা পেরেছেন।  তাইতো তিনি বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার।