স্বপ্নের সমাধি এভাবে!

আপডেটঃ ৯:৪৪ পূর্বাহ্ণ | জুলাই ০৩, ২০১৯

ক্রীড়া প্রতিবেদক :মুস্তাফিজুর রহমান পেলেন পাঁচ উইকেট। সাকিব আল হাসান পেলেন আরেকটি হাফ সেঞ্চুরি। হাফ সেঞ্চুরিতে শেষটা রাঙালেন মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে যথেষ্ট ছিল না এই পারফরম্যান্স। এগিয়ে আসার দরকার ছিল বাকিদের। বাকিরা তা পারেননি। পারেননি বলেই তো স্বপ্নের সমাধি দিল বাংলাদেশ।

নিজেদের সেরা দল নিয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলার সপ্নে ইংল্যান্ডের বিমানে চড়েছিলেন মাশরাফিরা। এজবাস্টনে মঙ্গলবার ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল বাঁচা-মরার। সেমির আশা টিকিয়ে রাখতে জয়ের বিকল্প ছিল না। কিন্তু নিজেদের ভুলে সহজ ম্যাচ হাতছাড়া করে স্বপ্নের জলাঞ্জলি দিলেন তামিম, সৌম্য, মুশফিক, লিটনরা।

আরেকটি বিশ্বকাপ, আরেকটি ভারত ম্যাচ। বড় মঞ্চে শেষ কয়েকবারই ভারত-জুজু কাটাতে পারেনি বাংলাদেশ। এবারও পারল না।  কিন্তু হাতের নাগালে থাকা ম্যাচ যেভাবে হারল বাংলাদেশ, তা নিয়েই যত প্রশ্ন, যত আক্ষেপ।

মুস্তাফিজের বিশ্বকাপের প্রথম পাঁচ উইকেটে ভারতকে ৩১৪ রানে আটকে রাখে বাংলাদেশ। বলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যাটিং করলেই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু তামিম, মুশফিক যেভাবে নিজেদের উইকেট উপহার দিয়েছেন, কিংবা লিটন ও সৌম্য যেভাবে আউট হয়েছেন, তাতে পুড়ছে পুরো দল। ২৮৬ রানে শেষ বাংলাদেশের ইনিংস। ১২ বল বাকি থাকতে ২৮ রানের পরাজয় বরণ করতে হয় লাল-সবুজ জার্সীধারীদের।

বড় মঞ্চে বড় তারকারা রান করেন। তামিমকে পাওয়া না গেল না পুরো বিশ্বকাপে। ভারতের বিপক্ষে রয়ে গেলেন নিষ্প্রভ। দলের যখন তাকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, সেদিন তামিম জ্বলে উঠতে ব্যর্থ। ৩১ বলে ২২ রানে তামিম মোহাম্মদ শামির বলে বোল্ড হয়ে ফেরেন সাজঘরে। সৌম্য সরকার আশা দেখান। কিন্তু হার্দিক পান্ডিয়ার বৈধ প্রথম বলেই আলগা শটে ক্যাচ দেন বিরাট কোহলির হাতে (৩৩)। মুশফিক নিজের সবচেয়ে পছন্দে শট সুইপ খেলতে গিয়ে আটকা পড়েন ২৪ রানে। ছক্কা মেরে পান্ডিয়াকে চ্যালেঞ্জ করা লিটন আউট হন শর্ট বল পুল করতে গিয়ে।

তাদের সবার আসা-যাওয়ার মাঝে সাকিব ধ্রুপদী ইনিংস উপহার দেন। আরেকটি হাফ সেঞ্চুরি তুলে বাংলাদেশকে লড়াইয়ে রাখেন। কিন্তু সাকিব-কাঁটা সরিয়ে ভারত স্বস্তি ফিরে পায়। পান্ডিয়ার স্লোয়ার ডেলিভারিতে ৬৬ রানে সাকিব যখন আউট হন, তখনো বাংলাদেশের রান লাগত ১৩৬। কে জানত, সপ্তম উইকেটে লড়াই করবে সাব্বির-সাইফউদ্দিন। তাদের ৫৫ বলে ৬৬ রানের লড়াকু জুটিতে কোহলি, ধোনিরা চিন্তায় পড়ে যান।

কিন্তু তাদের উদ্ধারের মানুষ একজন ছিলেন- জাসপ্রিত বুমরাহ। সাব্বিরকে নিজের শেষ স্পেলের প্রথম বলে বোল্ড করার পর বাংলাদেশের শেষ দুটি উইকেট নেন দুই ইয়র্কারে। মাঝে ভুবনেশ্বর কুমার ফেরান মাশরাফিকে।  সাব্বিরের ৩৬ বলে ৩৬ ও সাইফউদ্দিনের অপরাজিত ৫১ রানে বাংলাদেশের রান তিনশর কাছাকাছি গিয়ে ঠেকে। অথচ ব্যাটসম্যানরা ২২ গজে একটু ধৈর্য, একটু দায়িত্ব নিয়ে খেললে হয়তো সাব্বির, সাইফউদ্দিনদের ব্যাটিংয়েই নামা লাগত না!

শক্তির জায়গায় না পারলেও ভারতের দুর্বল জায়গায় আঘাত করে বাংলাদেশ ম্যাচে ফিরেছিল ভালোভাবেই। ভারতের টপ অর্ডার শক্তিশালী, মিডল অর্ডার ও লোয়ার অর্ডার দুর্বল, এমনটাই মনে করে ভারতীয় মিডিয়া। আগের দিন মাশরাফির কাছে সরাসরি প্রশ্ন এসেছিল ভারতের মিডল অর্ডার নিয়ে নির্ভার কি না বাংলাদেশ? ‘মেন্টাল গেমে’ হারেননি মাশরাফি। পান্ডিয়া, ধোনিদের পূর্ণ সম্মান দিয়েছিলেন। কিন্তু মাঠে তার ছিঁটেফোটাও দেখাননি। মাশরাফির হয়ে কাজটা করেছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান।

ঢাকায় যার শুরুটা ভারতের বিপক্ষেই পাঁচ উইকেট দিয়ে, এদিন আবার বার্মিংহামে ফিরে পেয়েছেন পাঁচ উইকেট। প্রিয় ব্যাটসম্যান রোহিত শর্মাকে ইনিংসের শুরুতেই ফেরানোর সুযোগ পেয়েছিলেন মুস্তাফিজ। শর্ট বল পুল করতে গিয়ে মিড উইকেটে ক্যাচ দেন রোহিত। তামিম ক্যাচটা  ধরতে পারেন না।  ৯ রানে রোহিতকে জীবন দিয়ে ভারতকে ম্যাচ উপহার দেন!

বিশ্বকাপে এর আগে তিনটি ম্যাচে জীবন পেয়ে দুটিকে সেঞ্চুরি এবং একটিকে হাফ সেঞ্চুরিতে রূপ দিয়েছিলেন ভারতীয় এই ওপেনার।  এবারো একই পথে হাঁটলেন। জীবন পাওয়ার পর যেন পেলেন ফ্রি লাইলেন্স। প্রথম বলে পুল শটে চার, তৃতীয় বলে ছক্কা। ৪৫ বলে তুলেছিলেন ফিফটি, ৯০ বলে একশ। এবারের বিশ্বকাপে চতুর্থ সেঞ্চুরি তুলে কুমার সাঙ্গাকারার এক আসরে চার সেঞ্চুরির রেকর্ডে ভাগ বসান এই ব্যাটসম্যান।

৩০তম ওভারে বাংলাদেশ পায় প্রথম সাফল্য। পার্ট টাইমার সৌম্য স্লোয়ার বলে ফেরান ১০৪ রান করা রোহিতকে। ডানহাতি মিডিয়াম পেসার ভাঙেন ১৮০ রানের ওপেনিং জুটি। যে ভাবনায় দলে ঢুকেছিলেন রুবেল, তা পূর্ণ করেছেন ভালোভাবে। শুরুটা ১২ রান দিয়ে হলেও মাঝের রান আটকে রাখার বড় কৃতিত্ব তার। তার স্লোয়ারে কাট করতে গিয়ে রাহুল ৭৭ রানে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন। কোহলি উত্তাপ ছড়ানোর অপেক্ষায় ছিলেন। ইনিংসের গভীর পর্যন্ত ব্যাটিংয়ের পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু মুস্তাফিজের দ্বিতীয় স্পেলে ওলটপালট হয়ে যায় সব।

৩৯তম ওভারে মুস্তাফিজ বোলিংয়ে এসে কোনো রান না দিয়ে জোড়া উইকেট তুলে নেন। প্রথমটা ভারত অধিনায়কের, পরেরটা পান্ডিয়ার। দুই উইকেট নিয়ে প্রাণ পায় বাংলাদেশ। পরবর্তীতে রুবেল, সাকিব, সাইফউদ্দিন চাপে রেখেছিলেন ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের। পন্তকে ফিরিয়ে সাকিব ম্যাচে প্রথম উইকেটের স্বাদ পান। শেষটা ছিল মুস্তাফিজময়। কার্তিক ও ধোনিকে দুই শর্ট বলে সাজঘরের পথ দেখানোর পর ইনিংসের শেষ বলে সামির উইকেট উপড়ে ফেলেন মুস্তাফিজ।

৫৯ রানে ৫ উইকেট নিয়ে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম পাঁচের স্বাদ পান মুস্তাফিজ। রুবেল ফেরার ম্যাচে পেয়েছেন ১ উইকেট। সাকিবের পকেটে গেছে আরেকটি উইকেট। মাশরাফি এদিনও নিজের ওভার শেষ করেননি। ৫ ওভারে রান দিয়েছেন ৩৬। নির্বিষ বোলিংয়ের চিত্র এতটাই ভয়াবহ যে, প্রথম এলবিডব্লিউর আবেদনের জন্য বাংলাদেশের অপেক্ষা করতে হয় ১৭তম ওভার পর্যন্ত।

এমন বোলিংয়ের পর মুস্তাফিজ যেভাবে বাংলাদেশকে ম্যাচে ফিরিয়েছিল তাতে জয় বাংলাদেশের প্রাপ্য ছিল। ব্যাটসম্যানরা শুধু ম্যাচটা হাতছাড়া করেননি, নিজেদের স্বপ্নের সমাধি দিয়েছেন। বরাবরই বড় মঞ্চে বাংলাদেশের মিশন শেষ হয় বড় কোনো হতাশা নিয়ে। তেমনই একটি দিন গেল।

রোহিতকে বাগে পেয়েছিলেন মুস্তাফিজ। তামিম এক ক্যাচ ছেড়ে হতাশায় ডুবিয়েছেন পুরো দলকে। ওই ক্যাচ মিসের পর পুরো দলের শরীরী ভাষা ছিল ছন্নছড়া।  তারপরও সাকিব, মাশরাফি বারবার উজ্জীবিত করেছিলেন। কিন্তু ভারতকে হারানোর জন্য যে জৌলুস দরকার ছিল, তা ছিল না।

হায়-হুতাশে শেষ হলো লড়াই। স্বপ্ন সবাই দেখে। কেউ ঘুমিয়ে, কেউ বা জেগে থেকে। জাগতিক পরিমণ্ডলে স্বপ্নের যেন শেষ নেই।  স্বপ্ন পূরণে প্রয়োজন সুযোগের স্বদব্যবহার। কিন্তু নিজেদের হাতের মুঠোয় থাকা সুযোগ যদি মানুষ নিজেই নষ্ট করে, তাহলে স্বপ্ন পূরণ হবে কীভাবে? বিশ্বকাপ হাতছাড়া হয়েছে। শেষ ম্যাচ এখনো বাকি। লর্ডসে শুক্রবার বাংলাদেশে প্রতিপক্ষ পাকিস্তান। শেষটা অন্তত জয় দিয়ে শেষ করতে পারে কি না মাশরাফির দল, সেটাই দেখার।