ঊনত্রিশে এপ্রিল মানে স্বজনের ঘরে শোক

আপডেটঃ ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ | এপ্রিল ২৯, ২০১৯

সি এন এ নিউজ,ডেস্ক : ঊনত্রিশে এপ্রিল মানে স্বজনের ঘরে শোক। সন্তান হারানো মায়ের আহাজারি, ভাই হারানো বোনের কান্না। এই দিনটি আসা মানে বুকের গহীনে সুপ্ত আতঙ্ক আবার জেগে ওঠা। মহাপ্রলয়ের কুণ্ডলী থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া মানুষদের স্মৃতির ক্যানভাসে ধ্বংসস্তুপের প্রতিচ্ছবি।

ঊনত্রিশে এপ্রিল মানে কিছু আলোচনা সভা, কিছু শোকসভা, দাবি আর কিছুটা আশ্বাসের বাণী। সংবাদপত্রের নিবন্ধে স্মৃতিচারণ আর কিছু প্রস্তাব। টেলিভিশন অনুষ্ঠানে সেই পুরানো কথার ফুলঝুড়ি। এইসব নিয়েই বছর ঘুরে ২৯ এপ্রিল আমাদের সামনে হাজির হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো এ ধরনের প্রলয় থেকে উপকূলকে রক্ষা করতে আমরা কতটা প্রস্তুত?

কক্সবাজারের পেকুয়ার উজানটিয়ায় নাজুক বেড়িবাঁধ। চকরিয়ার বদরখালীর মানুষ নিরাপত্তাহীন। মহেশখালীর সোনাদিয়া কিংবা কুতুবদিয়ার তাবালরচর, ধূরুংয়ের অবস্থাও একই রকম। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে সীতাকুণ্ডের দিকে অনেক পথ ঝুঁকিপূর্ণ। সন্দ্বীপের চারিদিকে বাঁধ হলেও বাংলাবাজার, সারিকাইতের অনেক মানুষ ঝুঁকি নিয়েই বসবাস করছেন বছরের পর বছর। বাড়ি হারাচ্ছে, আবার ছুঁটছে নতুন ঠিকানায়।

১৯৯১ সালে ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়টি এই এলাকায় প্রচণ্ড গতিতে আঘাত করেছিল। সে কারণে ওই এলাকার ছবিগুলোই আজ চোখের সামনে ভেসে উঠছে বার বার। উইকিপিডিয়া সূত্র অনুযায়ী, ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল ওই ঘূর্ণিঝড়ে। চট্টগ্রাম জেলার উপকূল এবং উপকূলীয় দ্বীপসমূহ, বিশেষ করে সন্দ্বীপ, মহেশখালী, হাতিয়ায় প্রচণ্ড গতিতে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড়টি।

কে ভেবেছিল সেদিন প্রচণ্ড গতির ঘূর্ণিঝড়টি সবকিছু কেড়ে নেবে? কে-ই বা কল্পনা করেছিল মাটির সঙ্গে মিশে যাবে সবকিছু? ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত বহু মানুষের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে। এলাকাগুলো ঘুরেও দেখেছি। কক্সবাজারের পেকুয়ার উজানটিয়ার মানুষেরা আসলেই উজানে আছে। খুবই নাজুক বাঁধ সেখানে। ছোট ধাক্কাতেই সব শেষ হয়ে যেতে পারে। চকরিয়ার বদরখালীর গ্রামগুলোর বয়সি মানুষদের অনেকে সেদিনের কথা স্মরণই করতে পারলেন না, স্বজন হারানোর শোকে তাদের অনেকে এখনো কাঁদেন। ভয়াল স্মৃতির কথা মনে করলেই চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।

সেদিন বিপর্যয়ের মুখে পড়া মানুষগুলো আজও দিনটির কথা মনে করতে পারেন না। স্বজন হারানোর কষ্টটা তাদের মনে আবার উঁকি দেয়। কেউ হারিয়েছেন বাবা-মা, ভাই-বোনসহ পরিবারের সবাইকে; কেউবা হারিয়েছেন অন্যান্য স্বজনদের। হাজারো মানুষ যুগ যুগে তিলে তিলে গড়া সম্পদ হারিয়ে পথে বসে। জীবন শুরু হয় আবার নতুন করে। পূর্ব-উপকূলের একটি বড় অংশ বিরাণ জনপদে পরিণত হয়েছিল সেদিন। অনেকের পক্ষেই পুনরায় জীবনের পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়নি। ওই ঘূর্ণিঝড়ের পরে বহু মানুষ স্থানচ্যুত হয়েছে; অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।

উপকূল ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে এমন বহু মানুষের সাক্ষাৎ পেয়েছি, যারা ২৯ এপ্রিলের সেই ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ে সব হারিয়েছিলেন। চরম বিপর্যয় মোকাবেলা করে সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছিলেন তারা। সেই কালো রাতে ঝড়ের ছোবলে মায়ের কোল থেকে হারিয়েছিল দুধের শিশু, ভাই হারিয়েছিল অতি আদরের বোন, স্বামী হারিয়েছিল প্রিয়তমা স্ত্রীকে, স্বজন হারানোর কান্না আর লাশের স্তুপে পরিণত হয়েছিল সমুদ্রপাড়সহ উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর নদীর তীর- অভিজ্ঞতা থেকে এমনটাই জানচ্ছিলেন জানাচ্ছিলেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। টগবগে তারুণ্যের সব হারানো সেই সব মানুষদের অনেকেই বার্ধক্যে ন্যূয়ে পড়েছেন। অনেকে আবার দুঃসহ সেই স্মৃতি নিয়ে চিরদিনের জন্য বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু সেই শোকগাঁথা এইসব এলাকার মানুষদের জীবনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। সেই ভয়াল রাতের ভয় এখনো এইসব এলাকার মানুষদের তাড়িয়ে ফেরে।

কক্সবাজারের চকরিয়ার বদরখালী ইউনিয়নের নাপিতখালী গ্রামের ৬৫ বছর বয়সি হাজী নূর মোহাম্মদ বলছিলেন, তাদের যৌথ পরিবারে সদস্য সংখ্যা ছিল ৩৬। ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে ১৬ জনের প্রাণহানি ঘটে। এর মধ্যে তার বাবা-মা ও পাঁচ ছেলেমেয়ে ছিল। শুধু বাবা ও এক ছেলের লাশ পেয়েছিলেন তিনি। বাকিদের কোনো সন্ধান মেলেনি। কথা বলতে গিয়ে অনেকের চোখ ভিজে ওঠে। সেদিন সন্ধ্যা ৭টায় বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। রাত ৮টায় বাড়িঘরে পানি ঢোকে। ৯টায় বাড়িঘর আর মানুষজন ভাসিয়ে নিতে শুরু করে। কেউ গাছ ধরেছেন, কেউ ভেসে গেছেন। রাত ১টার দিকে ভাটার টানে অধিকাংশ মৃতদেহ সমুদ্রে চলে যায়। এইসব দৃশ্য সমুদ্রপাড়ের মানুষদের স্মৃতিতে এখনো স্পষ্ট।

চকোরিয়ার বদরখালীতে মাত্র পাঁচ শতাংশ বাড়ি অবশিষ্ট ছিল, বাকিগুলো উড়ে যায়। বদরখালী বাজার থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে ফিশারি ঘাটে চায়ের দোকানে আলাপকালে সেইদিনের ঘটনা বর্ণনা করছিলেন অনেকেই। মোজাফফর আহমেদ, নাসির উদ্দিন, মো. হাশেম, আলী হোসেনসহ উপস্থিত প্রায় সবাই ওই ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব দেখেছেন। এখন আর তারা সেদিনের কথা মনে করতে চান না।

কক্সবাজারের পেকুয়ার উজানটিয়া, কুতুবদিয়ার তাবালচর, ধূরুং, চট্টগ্রামের বাঁশখালীর ছনুয়া, খানখানাবাদ, সন্দ্বীপের সারিকাইত, সীতাকুণ্ডের কুমিরার বহু মানুষের কাছে ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ের গল্প শুনেছি। সকলেই যথাযথ প্রস্তুতির অভাবের কথা বলেছেন। ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ সংকেত সম্পর্কে মানুষের ধারণা ছিল না, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের অভাব ছিল, বেড়িবাঁধের অবস্থা ছিল নাজুক, যোগাযোগ ব্যবস্থাও ছিল অত্যন্ত খারাপ। অন্যসব বিষয়গুলো বাদ দিয়ে মাত্র এই চারটি বিষয়ের সঙ্গে বর্তমান অবস্থার মিল খুঁজতে গেলে আমরা কী পাবো? কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন এলেও অনেক বিষয়ে এখনো সেভাবে নজর দেয়া হয়নি।

ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ : বিগত কয়েক বছরে ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ সংকেত নিয়ে ব্যাপক কাজ হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতির লক্ষ্যে দেওয়া সতর্কীকরণ বার্তা নিয়ে এখনো মানুষের মাঝে রয়েছে বিভ্রান্তি। ত্রুটিপূর্ণ সতর্কীকরণ সংকেত ব্যবস্থায় পরিবর্তন করা হয়েছে। মানুষের কাছে আরো সহজলভ্য করা হয়েছে। কিন্তু এটা মানুষের কাছে কতটা পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে; সে বিষয়ে এখনো প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। উপকূলের বহু মানুষের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, এদের অনেকেই সতর্কীকরণ বার্তা সম্পর্কে সুস্পষ্ট বলতে পারেননি। অনেকে আবার বলেছেন, আমাদের ওসব বোঝার দরকার নেই। সবাই যখন ঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যায়; আমরাও তখন যাই।

২০০৭ সালে সিডর আঘাত করেছিল বাগেরহাটের শরণখোলার সাউথখালী গ্রামে। সেখানকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, সংকেত সম্পর্কে তাদের মাঝে বেশ সচেতনতা। তবে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার রাস্তাটি ঠিক নেই। মানুষই প্রশ্ন করেন, আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার সুবিধা না থাকলে সতর্কীকরণ সংকেত সম্পর্কে সজাগ থেকে লাভ কী?

ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র : ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ের আগে উপকূল অঞ্চলে আশ্রয়কেন্দ্র তেমনটা ছিল না। ওই ঘূর্ণিঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পরে এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের নজর বাড়ে। সজাগ হয় আন্তর্জাতিক সাহায্য প্রদানকারী সংস্থাগুলো। পর্যায়ক্রমে অসংখ্য আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয় উপকূল জুড়ে। কিন্তু এখনো ঝুঁকিতে থাকা সব মানুষের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। বহু এলাকার মানুষ এখনো ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার কিংবা ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার দূরের আশ্রয়কেন্দ্রে যান। ফলে বহু মানুষ কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেন না। ঘূর্ণিঝড়গুলো বার বার আমাদের শিখিয়ে গেলেও ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে এখনো আসেনি পরিবর্তন। প্রায় প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়ের পরে অভিযোগ আসে, অমুক স্থানের তালাবদ্ধ আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে পারেননি ঘূর্ণিঝড় কবলিত মানুষেরা। অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ তো আছেই। প্রভাব খাটিয়ে প্রয়োজন নেই, এমন স্থানেও নির্মাণ করা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র।

ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ : উপকূলের বহু স্থানে রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ। বহু পুরানো বেড়িবাঁধ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি অনেক স্থানে। অন্যদিকে বার বার ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামতেরও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। কক্সবাজারের টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের বেড়িবাঁধ জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যাওয়ার পর পুনরায় উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। গত পাঁচ বছরে দ্বীপ অনেকখানি ছোট হয়ে এসেছে। বহু মানুষ চলে গেছে অন্যত্র। শুধু শাহপরীর দ্বীপ নয়, সরেজমিনে ঘুরে মহেশখালীর ধলঘাটা, মাতারবাড়ি, পেকুয়ার উজানটিয়া, কুতুবদিয়ার তাবালরচর, কিরণপাড়া, ধূরুং, সন্দ্বীপের সারিকাইতসহ বহু এলাকার ঝুঁকির চিত্র দেখেছি। হাজার হাজার মানুষ প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অনেক স্থানে বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাজে ধীরগতির কারণে মানুষের আতঙ্ক থেকেই যায়। শরণখোলার সিডর বিধ্বস্ত এলাকার মানুষ চেয়ে আছে বৃহৎ বাঁধ প্রকল্পের দিকে। কিন্তু কবে শরণখোলা নিরাপদ হবে; জানেনা বিপন্ন মানুষেরা।

নাজুক যোগাযোগ ব্যবস্থা : উপকূলের যোগাযোগ ব্যবস্থা এতটাই নাজুক যে, এক স্থান থেকে মানুষজনের অন্যস্থানে যাতায়াত অত্যন্ত কষ্টকর। বিশেষ করে দ্বীপ-চরের যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত খারাপ। ছোট দ্বীপের কথা বাদ দিয়ে আমরা যদি দ্বীপ উপজেলার কথা বলি; সেখানে সংকটের শেষ নেই। হাতিয়া কিংবা মনপুরায় দেখেছি, অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই খারাপ। দুর্যোগকালে অভ্যন্তরীণ যাতায়াতের বিষয়টি বড় হয়ে দেখা দেয়। মানুষজনকে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার তাগিদ দেওয়ার আগে অবশ্যই যাতায়াতের পথটা ভালো করতে হবে। ঘূর্ণিঝড়ের সিগন্যালের সময় অধিকাংশ দ্বীপ-চরে পানি উঠে যাওয়ায় মানুষজনের পক্ষে কোথাও যাওয়া সম্ভব নয়। তা ছাড়া দ্বীপ-চর থেকে মূল ভূখণ্ডে যাওয়ার ব্যবস্থা তো বরাবরই ঝুঁকিপূর্ণ। এইসব ক্ষেত্রে অবশ্যই মনোযোগ দিতে হবে।

দুর্যোগ মৌসুম এলে আতঙ্কে থাকে উপকূলবাসী। ২৯ এপ্রিলের বিশেষ দিনগুলো এলে তাদের সেই আতঙ্ক বাড়ে। আর ঘূর্ণিঝড়ের বিশেষ দিনগুলো সামনে এলে সেমিনার-সিম্পোজিয়াম হয়; বিভিন্ন দাবি নিয়ে মানববন্ধন হয়। এর পেছনে বেসরকারি সংস্থাগুলো খরচ করেন অনেক টাকা। এই টাকা উপকূলের ঝুঁকি কমাতে ব্যয় করা গেলে মানুষ বেশি উপকৃত হতে পারে। প্রতিবছর আমরা অন্তত একটি ছোট এলাকাকে ঝুঁকিমুক্ত করতে পারি; উপকূলের মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি।

আসুন প্রলয়ের এই দিবসগুলো এলে আমরা যেন শোক পালন আর আলোচনা সভায় আটকে না থেকে মনযোগ দেই প্রস্তুতিতে। মানুষের মাঝে সচেতনতা বাড়াই। আগামী প্রজন্মকে দুর্যোগ মোকাবেলায় সামর্থ্যবান করে গড়ে তুলি।