প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা : হাঙ্গেরি যাচ্ছে জোড়ামাথার শিশু

আপডেটঃ ১০:৫৩ অপরাহ্ণ | জানুয়ারি ০৪, ২০১৯

নিজস্ব প্রতিবেদক :পাবনায় জন্ম নেওয়া মাথা জোড়া লাগানো মেয়ে শিশুদের চিকিৎসার ভার নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর সহায়তায় এই শিশুদের চিকিৎসার জন্য পাঠানো হচ্ছে হাঙ্গেরি।

শুক্রবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে তারা এমিরেটাস এয়ার লাইন্সের একটি বিমানে করে হাঙ্গেরির উদ্দেশে রওনা হবে।

শিশুদের সাথে তাদের বাবা রফিকুল ইসলাম, মা তাসলিমা, বোন তাসনিম ও শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক ডা. হোসেন ইমাম হাঙ্গেরি যাবেন। সেখানে তাদের অন্তত তিন মাসের মতো থাকতে হতে পারে। তবে হাঙ্গেরি নিলেও সেখানে তাদের মাথা আলাদা করার মূল অপারেশন হবে না। সেখান থেকে ফেরার পর বাংলাদেশে মূল অপারেশন হবে।

শিশুদের বাবা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা আজ রাত দেড়টার দিকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে হাঙ্গেরির উদ্দেশে রওনা দেব। দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম আমাদের যাওয়ার জন্য বিমানের টিকিট ও আর্থিক সহায়তাসহ সব ধরনের কাগজপত্র হস্তান্তর করেছেন।’

শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, ‘ইতোমধ্যে তাদের হাঙ্গেরি পাঠানোর সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। রাতে তারা রওনা দেবে। তাদের সাথে আমাদের একজন চিকিৎসক যাবেন। হাঙ্গেরিতে শিশু দুটির চিকিৎসার সকল তত্ত্বাবধান করবে জার্মান ভিত্তিক “ফর বাংলাদেশ অর্গানাইজেশন” নামের একটি সংগঠন।’

এর আগে দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে অনুদান হস্তান্তর অনুষ্ঠানে সামন্ত লাল বলেন, ‘এক বছর ধরে মাথা জোড়া লাগানো শিশু ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নিচ্ছে। এর মধ্যে জার্মান ও হাঙ্গেরির দুই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক শিশু দুটিকে দেখানো হয়। তারা হাসপাতালেই দুই দফায় মাথার এনজিওগ্রামের মাধ্যমে ব্রেইনের প্রধান রক্তনালী পৃথক করেন। পরে তারা এই শিশুদের হাঙ্গেরিতে নিয়ে যৌথভাবে চিকিৎসা দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন।’

শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিত সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম বলেন, ‘বাংলাদেশেই তাদের চিকিৎসার দুই ধাপ সম্পন্ন করা হয়েছে। এখন তৃতীয় ধাপ সম্পন্ন করার জন্য হাঙ্গেরি পাঠানো হচ্ছে। পাঁচটি বিশেষজ্ঞ টিম তাদের চিকিৎসা পরিচালনা করবেন। সেখানে তাদের ব্রেইনের সফট টিস্যু আলাদা করাই প্রথম কাজ। এর সাথে সাথে ইনজেকশনের মাধ্যমে তাদের মাথার খুলি ফুলিয়ে ভিতরে কিছুটা ফাঁকা করা হবে।’

ডা. কালাম জানান, এ ধরনের রোগীর চিকিৎসায় সফলতা ২০ শতাংশের কম। তিনি বলেন, ‘তবুও আমরা আশাবাদী। আনুমানিক ছয় মাস পর ঢাকায় শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে তাদের মাথা পৃথক করার কাজ করা হবে।’

সংবাদ সম্মেলনে মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা ও আর্থিক অনুদানে তাদেরকে বিদেশ পাঠানো হচ্ছে। সম্পূর্ণ ব্যয় প্রধানমন্ত্রী বহন করবেন। প্রধানমন্ত্রী বাস্তব অর্থেই মানবতার নেত্রী।’

বিরল অপারেশন হতে যাচ্ছে বলে শিশুদের জন্য দোয়া করে তিনি বলেন, ‘দোয়া করি তারা যেন স্বাভাবিকভাবে জীবনযাবন করতে পারে। আশা করি হাঙ্গেরি থেকে দেশে আসার পরে তাদের মাথা পৃথক করাও সম্ভব হবে।’

রাবেয়া ও রোকাইয়া নামের এই জোড়ামাথার শিশুদের বাড়ি পাবনার চাটমোহর উপজেলার আটলঙ্কা গ্রামে। তাদের বাবা রফিকুল ইসলাম উপজেলার অমৃতকুণ্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক।

২০১৬ সালের ১৬ জুলাই পাবনার পিডিসি ক্লিনিকে সিজারের মাধ্যমে এই শিশুদের জন্ম হয়। জন্মের ঠিক পূর্বে আলট্রাসনোগ্রাফি করালেও জোড়া লাগানো মাথা ধরা পড়েনি। জন্মের পর জোড়ামাথা ধরা পড়লে তিন দিনের মাথায় তাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়। তখন একজনের জন্ডিস ছিল। বিএসএমএমইউতে দীর্ঘদিন তাদের চিকিৎসা চলে। সুস্থ হলে তাদের ছাড়পত্র দেওয়া হয়। পরে ১৬ মাস বয়সে ২০১৭ সালের ২০ নভেম্বর তাদের ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি করা হয়।

বাংলাদেশে জোড়া শিশু অস্ত্রোপচারে প্রথম সফলতা আসে ২০০৮ সালে। এরপর ২০১৬ সালের ৭ মার্চ বাগেরহাটে জন্ম নেওয়া জোড়া শিশুর অস্ত্রোপচার ওই বছরের ২০ জুন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে করা হয়। পূর্ণাঙ্গ শিশু থেকে অপূর্ণাঙ্গ শিশুটিকে পৃথক করা হয়। পূর্ণাঙ্গ শিশু মোহাম্মদ আলী সুস্থ হওয়ার পর গত ২০ জুলাই তাকে তার মায়ের কোলে তুলে দেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান।

এর আগে গত ২০১৬ সালের ১৭ জুন যশোরে জন্ম নেওয়া বুক জোড়া লাগানো মেয়েশিশু দুটি জন্মের চার দিনের মাথায় মারা যায়। জন্মের তিন দিনের মাথায় তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আনা হয়েছিল। তবে জোড়া মাথার শিশুর অপারেশনের প্রস্তুতি এই প্রথম।