ইয়াবার বিরু‌দ্ধে চল যাই যু‌দ্ধে

আপডেটঃ ১০:৩৮ অপরাহ্ণ | অক্টোবর ১৬, ২০১৮

॥ মো. রফিকুল ইসলাম ॥
দেখতে অনেকটা ক্যান্ডির মতো, স্বাদেও তেমনি মজাদার। লাল‌গোলা‌পী ব‌ড়ি সাম‌য়িক ও কৃ‌ত্রিম বলকারক ইয়াবা প্রকৃত নাম মেথঅ্যামফিটামিন। এলাকা ভিত্তিক এর রয়েছে বহু সাংকেতিক নামও। কেউ বলে বাবা, কেউ বলে কার্ড, কেউ বলে মুরব্বি, এনার্জি বলেও বুঝায় কেউ, এমনকি অনেকে এটার নাম দিয়েছে আফসোস এর বড়ি বলে। কৃ‌ত্রিম বলকারক হওয়ার কারণে শারী‌রিক ও মান‌ষিক পার্শ্বপ্র‌তি‌ক্রিয়া এতটাই ভয়াবহ যে, সারা‌দে‌শে যত অনাকা‌ঙ্খিত অন্যায়, অপরাধ, ছিনতাই, রক্তপাত ও খুনের ঘটনা ঘট‌ছে তার বে‌শির ভাগ ইয়াবা‌সে‌বি। লাল‌গোলা‌পি ব‌ড়ি এই মরণ নেশাটি সাম‌য়িক ও কৃ‌ত্রিম বলকারক বিধায় পাশ‌বিক নির্যাতন বা ধর্ষ‌ণে প্র‌রো‌চিত ক‌রে। ইয়াবা‌ সেবনকারী ড্রাইভাররা গা‌ড়ি চালায় বেপ‌রোয়া গ‌তি‌তে ঘটায় নিত্য নতুন সড়ক দূর্ঘটনা ও প্রাণহা‌নি। হতাশা, ব্যর্থতা ও কর্মহীনতা তৈ‌রি এবং আত্মহত্যায় নতুন প্রবণতা তৈ‌রি কর‌ছে ইয়াবা। দিন দিন বৃ‌দ্ধি পা‌চ্ছে বু‌দ্ধি প্র‌তিবন্দীর সংখ্যা। ইয়াবা সামা‌জিক ব্য‌ধি যা বর্তমা‌নে মহামা‌রি আকার ধারণ ক‌রে‌ছে। বাংলাদেশের বেশিরভাগ পরিবারই নিন্মভিত্ত ও নিন্মমধ্যভিত্ত। ইয়াবার বর্তমান খুচরা বাজার মুল্য অনুযায়ী একজন ইয়াবা সেবনকারি যদি ৫ থেকে ৭ টি ইয়াবা সেবন করে, তাহলে তাকে গুনতে হচ্ছে ১ হাজার ৩শ’ থেকে ৫শ’ টাকা। যা মাস শেষে গিয়ে দাঁড়ায় ৪০ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকা। নেশার পেছনে ৪০ হাজার টাকা খরচ হলে একটি লোক তার পরিবারকে বিশাল টাকা থেকে বি ত করছে। এমনও দেখা গেছে পরিবার অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছে অথচ মাদকসেবি পরিবারের খবর না রেখে সেই টাকা দিয়ে ইয়াবা সেবন করছে। ইয়াবা সেবনের ফলে শারীরিক, সামাজিক যতটুকু ক্ষতি হচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পারিবারিক ভাবে। একটি হাসিখুশি সুন্দও সাজানো পরিবার ধংস করে দিতে একজন ইয়াবা সেবনকারিই যতেষ্ঠ।
বাংলাদেশের টেকনাফ বর্ডার দিয়ে মাদক হিসেবে ইয়াবা প্রথম প্রবেশ করে ১৯৯৭ সালে। ইয়াবা হলো মেথাফেটামাইন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণ। মাদকটি একাধারে মস্তিষ্ক ও হৃদযন্ত্র আক্রমণ করে। এর পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন জার্মান প্রেসিডেন্ট এডলফ হিটলার তার মেডিকেল চিফকে আদেশ দিলেন দীর্ঘ সময় ব্যাপি যুদ্ধক্ষেত্রের সেনাদের যাতে ক্লান্তি না আসে এবং উদ্দীপনায় যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে বা বিমানের পাইলটের নিদ্রাহীনতা, মনকে উৎফুল, চাঙ্গা রাখার জন্য একটা কিছু আবিস্কার করতে। টানা ৫ মাস রসায়নবিদগণ চেষ্টা চালিয়ে মিথাইল অ্যামফিটামিন ও ক্যাফেইনের সংমিশ্রনে তৈরি করলেন ইয়াবা। ব্যাস! হিটলারের উদ্দেশ্য সফল। সেনারা মানসিক শক্তিতে বলিয়ান হল। ইয়াবার মূল শব্দ থাই থেকে উৎপত্তি। সংক্ষিপ্ত অর্থ পাগলা ওষুধ। অনেকে একে বলে ‘ক্রেজি মেডিসিন‘। মূল উপাদান মেথঅ্যামফিটামিন। আসলে ইয়াবা নেশা জাতীয় ওষুধ। এক ভয়াবহ মাদক যা মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্র এবং শরীরের যে কোনো অঙ্গকেই আক্রান্ত করতে পারে। ধীরে ধীরে অকেজো করে দেয় একটি সুন্দর দেহ, মন ও মানসিকতার। ইয়াবা আসক্তির কারণে মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটে। সম্প্রতি এই ইয়াবার সঙ্গে ক্যাফেইন বা হেরোইন মেশানো হয়, যা আরও ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ইয়াবার প্রচন্ড উত্তেজক ক্ষমতা আছে বলে যৌন উত্তেজক হিসেবে অনেকে ব্যবহার করে এটি। এতে যৌন উত্তেজনা বেড়ে যায়, মনে উত্তেজনা আসে। তাই অনেক যুবক যুবতীরা কৌতূহল বশত ইয়াবা সেবন করে থাকে। ক্ষুধা কমিয়ে দেয় বলে স্লিম হওয়ার ওষুধ হিসেবে অনেকে শুরু করে ইয়াবা সেবন। কিছুটা ওজন কমে। ঘুম কমিয়ে দেয়, সারা রাতের পার্টির আগে ক্লান্তিহীন সবল থাক‌তে অনেকের পছন্দ ইয়াবা। তবে সবগুলোই সাময়িক। কিন্তু সাময়িক আনন্দের এই ভয়ানক ট্যাবলেটটি যে তাদের স্থায়ী ভাবে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে, তা টের পায় বেশ কিছু দিন পর। তখন বুঝতে পারে জীবনটা যে পরিমান ধংস হয়েছে। তখন শুরু হয় আফসোস সেই সাথে হতাশা আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। দেখা যায়, কিছুদিন ইয়াবা সেবনের পর শুরু হয় এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া। কৌতূহল বশত ঃ কয়েকদিন সেবনের পরই আসক্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, এটি ছেড়ে দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তখন ইয়াবা ছাড়া আর কিছুই ভালো লাগে না। ওই মাদক পেতে যে কোনো হীন অপকর্ম করতেও হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। প্রথমেই শুরু হয় মানসিক অবসাদ গ্রস্থতা। শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়তে থাকে, মেজাজ হয় খিটখিটে, গলা মুখ শুকিয়ে আসতে থাকে, অনবরত প্রচন্ড ঘাম আর গরমের অসহ্য অনুভূতি বাড়তে থাকে। বাড়ে নাড়ির গতি, রক্তচাপ, দেহের তাপমাত্রা আর শ্বাস প্রশ্বাসের গতি। দেহে আসে মানসিক অবসাদ, ঘুম না হওয়া এবং চিন্তা ও আচরণে বৈকল্য দেখা দেয়। মানুষ আর মানুষ থাকে না। হয়ে উঠে হিংশ্র, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। ন্যায় অন্যায় বোধ লোপ পায়। হয়ে উঠে অপরাধ প্রবণ। অনায়াসে মানুষ খুন করতেও দ্বিধাবোধ করে না। এক সময়ে শরীরের অন্যান্য অঙ্গও অকেজো হয়ে যায়। দীর্ঘদিনের আসক্ত ব্যক্তিরা উচ্চ রক্তচাপে ভোগে। মস্তিষ্কের ভেতরকার ছোট রক্তনালিগুলো ক্ষয় হতে থাকে, এগুলো ছিঁড়ে অনেকের রক্তক্ষরণ শুরু হয়। স্মৃতিশক্তি কমে যায়, মানসিক নানা রোগের উপসর্গ দেখা দেয়। পড়াশোনা, কর্মক্ষেত্র বা পারিবারিক জীবনে বিরূপ প্রভাব পড়ে। সর্বক্ষেত্রে ব্যর্থতা বা পিছিয়ে পড়তে থাকায় আসক্ত ব্যক্তিরা বিষন্নতায় আক্রান্ত হয়। কারও কারও মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দেয়। দৃষ্টি বিভ্রম, শ্রুতি বিভ্রম আর অস্বাভাবিক সন্দেহ প্রভৃতি উপসর্গ থেকে এক সময় জটিল মানসিক ব্যধিও দেখা দেয়। বেশি পরিমাণে ইয়াবা সেবনের ফলে শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমের ব্যত্যয় ঘটিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত ডেকে আনতে পারে। সামগ্রিক দৃষ্টিতে ইয়াবা সেবনের ক্ষতি অসীম ও অপূরণীয় এটি পরিবারকে ধ্বংস করে। সমাজকে করে কলুষিত এবং দেশকে করে পঙ্গু। পারিবারিক ও সামাজিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পরে। রাষ্ট্রের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়। এই মাদক জীবন থেকে জীবন এবং হৃদয়ের আবেগ অনুভুতি কেড়ে নেয়। আলোর পথ ছেড়ে নিয়ে যায় অন্ধকার পথে। স্বাধীন হৃদয় পরিণত হয় নেশার দাসে।
ইয়াবা আসক্তি প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ করা অনেক সহজ। সুতরাং প্রতিরোধের উপর বেশি মনোযোগ দিতে হবে। এই মাদকের আগ্রাসন থেকে দেশের যুব সমাজকে রক্ষা করতে প্রয়োজন সামগ্রিক প্রতিরোধ। আসক্ত ব্যক্তি, যিনি পুনরায় স্বাভাবিক সুস্থ জীবন ফিরে পেতে চায়, তাদের নিরাশ হওয়ার কিছু নেই। এ কথা মোটেই সত্য নয় যে, তারা আর কখনোই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারবে না। শুধু মাত্র প্রয়োজন ধৈর্য সহকারে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা। একবার কেউ আসক্ত হয়ে গেলে তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার না করে ভালোভাবে বোঝাতে হবে। কোন ভাবেই আসক্ত ব্যক্তিকে বকাবকি, ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখা যাবে না। চিকিৎসার জন্য রাজি করিয়ে তার শারীরিক বিভিন্ন সমস্যার চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক চিকিৎসার জন্য মনোরোগ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরী। তারা ফিরে যেতে পারছে মাদকমুক্ত জীবন ধারায়। ওষুধ, সাইকোথেরাপি ও অন্যান্য উপায়ে মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে স্বাভাবিক ও সুস্থ জীবনযাপন পদ্ধতিতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। পরিবর্তন করার চেষ্টা করা হয়, তার আগের পারিপার্শিক পরিবেশ, যা তাকে মাদকাসক্ত হতে উদ্ধুদ্ধ করেছিল। এতে মানসিক রোগ চিকিৎসক ও মনোবিজ্ঞানীর যেমন ভূমিকা রয়েছে, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে পরিবার, আত্মীয়স্বজন আর প্রকৃত ভালো বন্ধুরও। একজন নেশাসক্ত ব্যক্তি সবার সম্মিলিত সহযোগিতায়ই আবার ফিরে পেতে পারে মাদকমুক্ত সুস্থ জীবন। আর প্রতিরোধ একক ভাবে কোনো ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ বা দেশের পক্ষে করা সম্ভব নয়। সবাইকে নিয়েই এই প্রতিরোধ যুদ্ধে নামতে হবে এবং এই যুদ্ধ চলমান রাখতে হবে। জোড়দার তুলতে হবে মাদক প্রতিরোধ সামাজিক আন্দোলন। দৃঢ় পারিবারিক বন্ধন ও সঠিক শিক্ষা মাদক প্রতিরোধে গুুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। প্রথমেই এসব দায়িত্ব বর্তায় পরিবারের উপর। আর সমাজ ও দেশের দায়িত্ব মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে ঘৃণা ও অপরাধী হিসেবে বড় করে না দেখে কোথা থেকে, কীভাবে, কারা মাদক সরবরাহকারী বা কারা এসবের মূল হোতা, তাদের বিচার ও শাস্তির আওতায় আনা। তবেই এই ভয়ানক ইয়াবার ছোবল থেকে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম ও কোমলমতি সন্তানদের রক্ষা করা সম্ভব হবে। মনে রাখতে হবে মাদক সেবন কারিকে নয়, ঘৃণা করতে হবে মাদককে এবং সম্পৃত্ত ব্যক্তিকে সচেতন করতে হবে এর ভয়াবহতা সর্ম্পকে। স্বাভাবিক সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে তাদের প্রতি ঘৃণা নয়, বরং সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। মাদক তথা ইয়াবার বিরু‌দ্ধে চলমান যু‌দ্ধে ফলপ্রসু বিজয় হ‌লেই ক‌মে যা‌বে সামা‌জিক অপরাধ হত্যা ধর্ষণ ও সড়ক দূর্ঘটন‌সহ বহু অনাকাঙ্খিত ঘটনা। তাই এখনই উচিত সবাইকে একতাবদ্ধ হই “ইয়াবার বিরু‌দ্ধে চল যাই যু‌দ্ধে ” মাদক বিরোধী স্লোগানে ।