মুফতি হান্নানের যে স্বীকারোক্তিতে আসামি তারেক, বাবররা

আপডেটঃ ৯:৪০ পূর্বাহ্ণ | অক্টোবর ১০, ২০১৮

ডেস্ক রিপোর্ট: ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন মুফতি আব্দুল হান্নান। ২০০৫ সালের ৫ অক্টোবর তিনি অন্য মামলায় গ্রেপ্তার হন। এরপর বিভিন্ন মামলায় নেওয়া রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করে গ্রেনেড হামলা মামলায় জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ায় পরবর্তীতে এই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নেওয়া হয়।

রিমান্ডের একপর্যায়ে ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর তিনি গ্রেনেড হামলা মামলায় আদালতে প্রথম দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। মুফতি হান্নান ও তার সহযোগীদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ভিত্তিতে ২০০৮ সালের ১১ জুন প্রাক্তন উপমস্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি আইন এবং বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে পৃথক দুটি চার্জশিট আদালতে দাখিল করা হয়।

ওই চার্জশিটের ভিত্তিতে মামলার ৬১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হওয়ার পর রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে মামলাটি ২০০৯ সালের ৩ আগস্ট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন বিচারক মাসদার হোসেন অধিকতর তদন্তের আদেশ দেন। মামলাটি অধিকতর তদন্তে থাকাকালীন ২০১১ সালের ৭ এপ্রিল কারাগারে থাকা মুফতি হান্নান মামলায় দ্বিতীয়বার আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন।

তৎকালীন ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম হাবিবুর রহমান ভূঁইয়া ওই জবানবন্দি রেকর্ড করেন।

স্বীকারোক্তিতে মুফতি হান্নান বলেন, আমি এই মামলায় পূর্বে একবার স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলাম। তখন আমি সব কথা বলতে পারি নাই। মাননীয় মহানগর দায়রা জজ আদালতে স্বেচ্ছায় একটি দরখাস্ত দিয়ে আরো কিছু কথা বলার ও লেখার আছে জানালে তিনি আমার দরখাস্ত মঞ্জুর করেন। আজকে কারা কর্তৃপক্ষ আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন ওই বিষয়ে আমার বক্তব্য আপনার দ্বারা রেকর্ড করতে।

আমি বিবেকের তাড়নায় পূর্বের প্রদত্ত দোষ স্বীকারোক্তির সাথে আজকের বক্তব্য পেশ করিতেছি। আমি যেভাবে বলব হুবহু সেভাবে লেখার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করিতেছি।

তিনি বলেন, ২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার পরাজিত হলে বিএনপি জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে সরকার গঠন করে। তখন বিএনপির সাথে আমাদের সংগঠনের স্বার্থে সম্পর্ক আরো জোরদার করার লক্ষ্যে হরকাতের আমির মাওলানা আব্দুস সালাম, শেখ ফরিদ, মাওলানা ইয়াহিয়া, আবু বকর, জাহাঙ্গীর বদর একত্রে চট্টগ্রামের এমপি সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও কুমিল্লার এমপি কায়কোবাদের সাথে যোগাযোগ করেন। তারা আব্দুস সালামসহ তাদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করেন।

১৯৯৬ সালে আমাদের যে ৪১ জন নেতা-কর্মীকে রাজধানীতে আটক করা হয়েছিল তাদের জামিনের ব্যবস্থা করে দেয়। এইভাবে তাদের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত থাকে। ২০০৩ সালের শেষের দিকে আমাদের আমির মাওলানা আব্দুস সালাম, শেখ ফরিদ ও মাওলানা তাজউদ্দিনের সাথে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের যোগাযোগ হয়। যোগাযোগের মাধ্যমে বাবর সাহেবের বেইলি রোডের বাসায় যায়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন জি কে গাউস, আরিফুল ইসলাম আরিফ, ইয়াহিয়া, আবু বককর ওরফে আব্দুল করিম। ওই সময় আমিও উপস্থিত ছিলাম। সেখানে আমির সাহেবের সাথে কথা বলে এবং জি কে গাউস এবং আরিফুল ইসলাম ওরফে আরিফকে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এদেরকে সিলেটে কাজের ব্যাপারে বলে এবং স্থানীয়ভাবে কাজের জন্য হুকুম দেয়। সেখানে স্থানীয় বিএনপি এবং হরকাতুলের লোক দ্বারা বিভিন্ন জায়গায় বিস্ফোরণ ঘটায়। ২০০৪ সালের প্রথম দিকে হরকাতুল জেহাদের একটা মিটিং হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন আমাদের আমির মাওলানা আব্দুস সালাম, মাওলানা শেখ ফরিদ, হাফেজ জাহাঙ্গীর বদর (জান্দাল)। ওই মিটিং হয় দারুল আরকাস মাদ্রাসায় (হরকাতের অফিস), মোহাম্মাদপুর বাস স্ট্যান্ড (দোতলায়)। ওই মিটিংয়ে আবু বক্কর ও ইয়াহিয়াও ছিল। তারেক জিয়া ও বাবরের সঙ্গে কীভাবে দেখা করা যায়, এই সম্পর্কে আলোচনার জন্য এরা মিটিং করে। পরে আমরা মোহাম্মাদপুর সাত মসজিদে মাওলানা আব্দুস সালাম, মাওলানা আব্দুর রউফ, মাওলানা তাজউদ্দিন, কাশ্মীরি নাগরিক আব্দুল মাজেদ ভাটসহ একত্রে পরামর্শ করে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের হত্যার পরিকল্পনা করি।

মাওলানা তাজউদ্দিন গ্রেনেড সরবরাহের দায়িত্ব নেয়। তাজ ভাই উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু ও প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর আমাদের সাহায্য করবে মর্মে জানায় এবং তারেক জিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর একদিন (তারিখ ও সময় মনে পড়ছে না) মুরাদনগরের এমপি কায়কোবাদ সাহেব আমাদের হাওয়া ভবনে নিয়ে গিয়ে তারেক জিয়া ও হারিছ চৌধুরী সাহেবের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। আমরা আমাদের কাজকর্মের জন্য তাদের সাহায্য-সহোযোগিতা চাইলে তারেক জিয়া আমাদের সর্ব প্রকার সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। এরপর আমরা শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের হত্যার জন্য মোহাম্মাদপুরসহ আরো কয়েক জায়গায় গোপনে মিটিং করি।

২০০৪ সালের আগস্ট মাসে (তারিখ স্মরণ নাই) সিলেটে গ্রেনেড হামলার প্রতিবাদে ঢাকার মুক্তাঙ্গনে আওয়ামী লীগের প্রতিবাদ সভার সংবাদ জানতে পারি। সেখানে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের ওপর আক্রমণের সিদ্ধান্ত হয়। আমি, মাওলানা আবু তাহের, শেখ ফরিদ, মাওলানা তাজউদ্দিন আল মারকাজুলের গাড়িতে করে মাওলানা রশিদসহ হাওয়া ভবনে যাই। সেখানে হারিছ চৌধুরী, লুৎফুজ্জামান বাবর, জামায়াতে ইসলামীর মুজাহিদ, ব্রিগেডিয়ার রেজ্জাকুল হায়দার, ব্রিগেডিয়ার আব্দুর রহিমকেও উপস্থিত পাই। কিছুক্ষণ পর তারেক রহমান আসেন। আমরা তাদের কাছে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের ওপর হামলা করার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তাদের সহায়তা চাই। তখন তারা আমাদের সকল প্রকার প্রশাসনের সহায়তার আশ্বাস দেন। তারেক সাহেব বলেন যে, আপনারদের এখানে আর আসার দরকার নাই। আপনারা বাবর সাহেব ও আব্দুস সালাম পিন্টুর সাথে যোগাযোগ করে কাজ করবেন। তারা আপনাদের সকল প্রকার সহায়তা করবে।

১৮ আগস্ট আমি, আহসান উল্লাহ কাজল, মাওলানা আবু তাহের আব্দুস সালাম পিন্টুর ধানমন্ডির সরকারি বাসায় যাই। সেখানে আব্দুস সালাম পিন্টু, বাবর, মাওলানা তাজউদ্দিন, কমিশনার আরিফ ও হানিফ পরিবহনের হানিফ উপস্থিত ছিল। আব্দুস সালাম পিন্টু ও লুৎফুজ্জামান বাবর বলেন যে, কমিশনার আরিফ ও হানিফ সাহেব আপনাদের সকল প্রকার সাহায্য ও সহযোগিতা করবে। আমাদের সকল প্রকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে। সে মোতাবেক ২০ আগস্ট মুফতি মঈন ওরফে আবু জান্দাল ও আহসানউল্লাহ কাজল আব্দুস সালাম পিন্টুর বাসা থেকে ১৫টি গ্রেনেড, ২০ হাজার টাকা গ্রহণ করে বাড্ডার বাসায় নিয়ে আসে। ২১ তারিখ আগস্ট মাস, ২০০৪ ইং আমরা আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে গ্রেনেড হামলা চালাই। ২১ আগস্ট ২০০৪ তারিখে আওয়ামী লীগের অফিসের সামনে গ্রেনেড হামলার বিষয়ে পূর্বে দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছি। আজকে অবশিষ্ট তথ্য দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে দিলাম।