এইডস মানেই মৃত্যু নয়

আপডেটঃ ১:১০ অপরাহ্ণ | জুলাই ২৫, ২০১৮

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :ম্যালেরিয়া, ডায়াবেটিস এবং ক্যান্সারের মতোই এখন এইডসও নিরাময় যোগ্য। এইডস হলেই মৃত্যু হবে এমন কথার এখন আর কোন ভিত্তি নেই। যদি আমাদের প্রাচীন ধ্যান-ধারণা এবং সামাজিকতার পরিবর্তন হয় তবে এইডসও নিরাময় সম্ভব বলে উল্লেখ করেছেন খ্যাতনামা ব্রিটিশ সংগীতশিল্পী এলটন জন।

সোমবার থেকে আমস্টারডামে পাঁচ দিনব্যাপী ২২তম আন্তর্জাতিক এইডস সম্মেলন শুরু হয়েছে। ২৭ জুলাই সম্মেলন শেষ হবে। চলতি বছর আন্তর্জাতিক এই সম্মেলনের মূল উপপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘ব্রেকিং ব্যারিয়ার্স, বিল্ডিং ব্রিজেস।’

jagonews24

এইচআইভি এবং এইডস আক্রান্তদের পাশে কার্যকরভাবে দাঁড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে এবারের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এইডস সম্মেলনে যোগ দিতে দু’দিনের সফরে নেদারল্যান্ডসের রাজধানী আমস্টারডামে আছেন ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স হ্যারি। ওই সম্মেলনে এলটন জনও তার সঙ্গে যোগ দিয়েছে।

আফ্রিকার দেশ লেসেথো ও বতসোয়ানাভিত্তিক দাতব্য সংস্থা সেন্টেবেইলের সঙ্গে যুক্ত প্রিন্স হ্যারি। ২০০৬ সালে প্রিন্স হ্যারি এই সংস্থা গড়ে তোলেন। সেন্টেবেইল শব্দের মানে হলো ‘আমাকে ভুলো না।’ স্থলবেষ্টিত লেসেথোতে মরণব্যাধী এইচআইভি/এইডস আক্রান্ত হাজার হাজার শিশু ও তরুণদের জন্য কাজ করে এই সংস্থাটি।

ওই সমাবেশে এইডস বিষয়ে একজন সচেতন কর্মী হিসেবে যোগ দিয়েছেন ৭১ বছর বয়সী গায়ক এলটন জন। তিনি সিএনএনকে তার এইডস আক্রান্ত হওয়ার পর যেসব অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন তা তুলে ধরেন।

এইডসে আক্রান্ত হওয়ার পর অনেক কিছুই বদলে গিয়েছিল বলে জানান এই জনপ্রিয় গায়ক। তিনি সে সময়টায় খুব হতাশ হয়ে গিয়েছিলেন। মানুষের কাছ থেকে সহমর্মীতার অভাববোধ করছিলেন। আর সে সময়টাতেই তিনি এলজিবিটির মতো বিভিন্ন সংস্থা যেগুলো এইচআইভির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেগুলোর প্রতি মানবতা দেখাতে শুরু করেন।

তিনি জানান, একজন এইডস আক্রান্ত রোগীকে যে কুসংস্কার এবং মানুষের ভুল ধারণার মুখোমুখি হতে হয় তা তাকে হতাশ করে তোলে। ফলে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং চিকিৎসায় তারা আশা হারিয়ে ফেলে। কিন্তু তাদের একটু সহমর্মীতা এবং ভালোবাসা প্রয়োজন। কারণ এই রোগেরও প্রতিষেধক বেরিয়েছে। একেবারে নিশ্চিহ্ন করা না গেলেও সঠিকভাবে চিকিৎসা করানো সম্ভব হলে একজন এইডস আক্রান্ত রোগীও দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে পারেন।

jagonews24

৮০’র দশকে মানুষের মধ্যে এই বিশ্বাস ছিল যে, এইডস ছোঁয়াচে রোগ। এইডস আক্রান্তদের সংস্পর্শে গেলেই এ রোগ হতে পারে। অথচ সে সময়ই প্রিন্সেস ডায়না এইডস আক্রান্ত রোগী পাশে ছিলেন, তাদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। কখনও প্রকাশ্যে আবার কখনও নিভৃতে তিনি এসব রোগীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ন্যাশনাল এইডস ট্রাস্টের (এনএটি) একজন পৃষ্ঠপোষক ছিলেন প্রয়াত এই প্রিন্সেস। তার ছোট ছেলে প্রিন্স হ্যারিও মায়ের দেখান পথেও চলছেন। এইডস আক্রান্ত রোগীদের নিয়ে কাজ করা সংস্থায় প্রিন্স হ্যারিকে পেয়ে আনন্দিত এলটন জন।

তিনি বিশ্বাস করেন যে, ২০৩০ সালের মধ্যে এইডসের সমাপ্তি ঘটাতে ইউনিএইডস যে লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে তারা তা পূরণ করতে পারবে। এইডসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্রিটেনের প্রিন্স হ্যারির ‘প্যাসন ফর এইচআইভি’কে তিনি সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

এলটন জন বলেন, এইডসের মতো আর কোন রোগেরই বৈজ্ঞানিকভাবে এত অগ্রগতি ঘটেনি। এখন আর কাউকেই এইডসের কারণে মারা যেতে হবে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

মঙ্গলবার সকালে প্রিন্স হ্যারির সঙ্গে এইডস সমাবেশের মঞ্চে ওঠেন এলটন জন। সে সময় এলটন জন এইডস ফাউন্ডেশনকে ১২০ কোটি ডলার অংশীদারিত্বের ঘোষণা দেন ডিউক অব সাসেক্স। এই সংস্থা এইচআইভি আক্রান্তদের নিয়ে কাজ করবে। বিশেষ করে ২৪ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং চিকিৎসায় কাজ করে যাবে।

সমাবেশের মঞ্চে উঠে আনন্দ প্রকাশ করেন প্রিন্স হ্যারি। তিনি জানান যে, জন এলটনের সঙ্গে এই সমাবেশে যোগ দিতে পেরে তিনি গর্বিত। একটা সময় এইডসকে ছোঁয়াচে রোগ মনে করা হতো। এইডস আক্রান্ত রোগীর পরিবার-পরিজনও তাদের দূরে ঠেলে দিতেন। চিকিৎসার অভাবেই অধিকাংশ এইডস আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু হয়।

কিন্তু বর্তমানে এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। এইডসের বিষয়ে মানুষ সচেতন হয়েছে। এর প্রতিষেধকও আবিষ্কার করেছেন চিকিৎসকরা। তাই ভালোভাবে চিকিৎসা দেয়া গেলে একজন এইডস আক্রান্ত রোগীও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।

jagonews24

মানবদেহে এইচআইভি প্রতিরোধ তৈরি করা সম্ভব এমন একটি চিকিৎসাপদ্ধতি সম্প্রতি আবিষ্কার করেছেন গবেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্র, রুয়ান্ডা, দক্ষিণ আফ্রিকা, উগান্ডা আর থাইল্যান্ডের প্রায় ৪০০ অধিবাসীকে চার মাসে চারটি প্রতিষেধক দিয়ে পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষা চালানোর পর তাদের দেহে এইচআইভি প্রতিরোধকারী ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে বলে তথ্য উঠে এসেছে ওই গবেষণায়।

প্রতি বছর আনুমানিক ১৮ লাখ নতুন এইচআইভি সংক্রমণের ঘটনা ঘটছে। এইচআইভির চিকিৎসায় নানাবিধ অগ্রগতি হলেও এই ভাইরাসের নিশ্চিত প্রতিষেধক এখনও মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছে। প্রেপ বা প্রি এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস নামের ওষুধটি এইচআইভি সংক্রমণ রোধে কার্যকর এবং নিয়মিত সেবন করতে হয়।

আক্রান্ত হওয়ার আগে নিয়মিত এই ওষুধ গ্রহণ করলে এইচআইভি সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকে না। এইচআইভি ভাইরাস মানবদেহে প্রবেশ করার পর দেহের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে টিকে থাকতে পারে, যা এই ভাইরাসের প্রতিষেধক তৈরির পেছনে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে মনে করা হয়।