যে ৮ লক্ষণে বুঝবেন আপনার ঠান্ডা লাগতে যাচ্ছে

আপডেটঃ ১০:০৩ পূর্বাহ্ণ | ডিসেম্বর ০৫, ২০১৭

সি এন এ নিউজ,ডেস্ক :যদি আপনি আপনার শরীরের পাঠানো ক্ষুদ্র সতর্ক সংকেতের দিকে মনোনিবেশ করতে পারেন, তাহলে আপনি আপনার ঠান্ডা হওয়ার পূর্বেই তা প্রতিহত করতে পারবেন।

এ প্রতিবেদনে ঠান্ডাপূর্ব ৮টি লক্ষণের উল্লেখ করা হলো যা দেখা দিলে বুঝবেন যে আপনার ঠান্ডা হতে যাচ্ছে এবং এসব লক্ষণ অংকুরেই বিনষ্ট করে আপনি পুরো শীতে সুস্থ থাকতে পারেন।

১. ক্লান্তি অনুভব করা

 

আমরা সাধারণত যেকোনো ছোটখাট শারীরিক উপসর্গকে এড়িয়ে যাই, কিন্তু এটি হচ্ছে আমাদের প্রথম ভুল। কারণ এর পরিবর্তে আসলে আমাদের শরীরের দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। মাঝে মাঝে অতি ক্লান্তি কি আপনাকে দিনে ঘুমানোর জন্য প্ররোচিত করে? এটি ইঙ্গিত করে যে আপনার ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, তাই পূর্ণ রাত নিদ্রা যাপন নিশ্চিত করুন, আপনি অতিরিক্ত নিদ্রালু হোন বা নাই হোন- এ নিদ্রা যাপন আপনাকে কোয়ালিটি স্লিপ প্রদান করবে। কার্নেগি মেলনের গবেষকদের দ্বারা সম্পাদিত গবেষণায় পাওয়া যায়, যারা রাতে সাত ঘণ্টার কম ঘুম যায় তাদের ঠান্ডা হওয়ার সম্ভাবনা যারা রাতে আট ঘণ্টার বেশি ঘুম যায় তাদের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি।

২. শ্বাসরোধী নাক
যখন আপনি উপলব্ধি করবেন আপনি আপনার নাকের মাধ্যমে সহজে শ্বাস নিতে পারছেন না, তখন বুঝে নিতে পারেন যে ঠান্ডার জীবাণুকে বাধা দেওয়ার জন্য সম্ভবত আপনার নাসিকা পথের কিছু আর্দ্রতা প্রয়োজন হবে। নর্থ ক্যারোলিনার ডুরহামে অবস্থিত ডিউক ইন্টিগ্রেটিভ মেডিসিনের অ্যাসিস্ট্যান্ট ক্লিনিক্যাল প্রফেসর ইভানজেলাইন লাউসিয়ার বলেন, ‘কোল্ড বা ঠান্ডা হচ্ছে ছোটখাট আপার রেসপিরেটরি ব্যাধি এবং সাধারণত এর প্রথম উপসর্গ শুরু হয় নাকে।’ তিনি যোগ করেন, ‘কোল্ড ভাইরাস নাসিকা এলাকাকে আক্রমণ করে এবং শরীর অধিক মিউকাস নিঃসরণের মাধ্যমে যুদ্ধ করে ভাইরাসকে দূর করার জন্য।’ তিনি আরো বলেন, ‘আপনি হাইড্রেটেড থেকে আপনার শরীরকে সাহায্য করতে পারেন, কারণ হাইড্রেটিং আপনার মিউকাসকে পাতলা রাখবে ও মিউকাস সহজে অতিক্রম করবে এবং আপনার মিউকাস মেমব্রেন আর্দ্র থাকবে।’

৩. মানসিক চাপ

 

আপনি কি স্ট্রেস বা মানসিক চাপে ভুগছেন? যদি তাই হয় আপনি ঠান্ডার সম্মুখীন হতে যাচ্ছেন। ডাক্তাররা এখনো স্ট্রেস এবং অসুস্থতার মধ্যে সম্পর্ক বোঝার চেষ্টা করছেন, কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট: ‘দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস’ ইমিউন সিস্টেমের জন্য ভালো নয়। নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত এক গবেষণা থেকে জানা যায়, যেসব লোকেরা অধিক মানসিক চাপে ছিল তাদের অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি ছিল। সম্প্রতি নতুন এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রকৃতপক্ষে স্ট্রেস হরমোনের বৃদ্ধি আপনাকে অসুস্থ করে না- কিন্তু আপনার শরীরে বর্ধিত মাত্রার হরমোন এমনভাবে ব্যবহারজীর্ণ হয়ে পড়ে যে আপনার শরীর ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তাদেরকে ব্যবহার করতে পারে না।

৪. গলায় প্রদাহ

আপনার গলায় প্রদাহ হলে বা ব্যথা হলে ধরে নিতে পারেন আপনার ঠান্ডা হতে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে আপনি লবণ পানি দিয়ে গার্গল বা কুলকুচা করতে পারেন, কারণ লবণ পানির কুলকুচা গলার প্রদাহ কমায়। ডা. লাউসিয়ার বলেন, ‘লবণ পানির কুলকুচা গলা ও নাসিকা পথের ফোলা ও মিউকাস হ্রাসে সাহায্য করে, যা আপনাকে গলার ক্ষত থেকে রক্ষা করবে।’ গবেষকরা লবণ ও গরম পানি মিশ্রিত এই ঘরোয়া চিকিৎসাটি সাপোর্ট করেন। জাপানের এক গবেষণায়, কিছু স্বেচ্ছাকর্মীকে লবণ পানি দিয়ে কুলকুচা করতে বলা হয় এবং অন্যদেরকে তা করতে মানা করা হয়। ৬০ দিন পর, কুলকুচা করা দলটির ঠান্ডা ৪০ শতাংশ হ্রাস পায়, যেখানে কুলকুচা না করা দলটির ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। মায়ো ক্লিনিকের পরামর্শ মতে, কুলকুচা করার জন্য আট আউন্স গরম পানির সঙ্গে ১/৪ থেকে ১/২ চা চামচ লবণ মিশ্রিত করুন।

৫. নাকের কনজেশন

নাকের কনজেশন বা নাক বন্ধের জন্য আপনি যদি সচরাচরের তুলনায় বেশি নাক ঝাড়েন, তবে তা হতে পারে ‘আপনি অসুস্থ হতে যাচ্ছেন’ এর লক্ষণ। ডা. লাউসিয়ার বলেন, এটি সিজনাল অ্যালার্জির উপসর্গ নাকি ঠান্ডার উপসর্গ তা নির্ণয় করা কঠিন হতে পারে। উভয়ক্ষেত্রে হট শাওয়ার বা গরম গোসল বিস্ময়কর কাজ করতে পারে। এতে মিউকাস চলাচল সহজ হবে। নাকের কনজেশন থেকে মুক্তির আরেকটি নিরাপদ উপায় হচ্ছে, স্যালাইন স্প্রে বা নেটি পট ব্যবহার করা। ডা. লাউসিয়ার বলেন, ‘এসব মিউকাসকে পাতলা করে মিউকাস চলাচলকে সহজ করে।’ তিনি বলেন, ‘লবণ এবং বাষ্প স্ফীত মেমব্রেনকে ছোট করতে সাহায্য করে, যার ফলে আপনি সহজে শ্বাস নিতে পারেন।’ মিউকাস চলাচল সহজতার অন্য একটি পদ্ধতি হচ্ছে হিউমিডিফাইয়ার ব্যবহার করা, বিশেষ করে বাইরের বায়ু শুষ্ক থাকলে। ডা. লাউসিয়ার বলেন, ‘কোল্ড বা ঠান্ডার সময় শুষ্ক বায়ু মেমব্রেন এবং মিউকাসকে দ্রুত শুকিয়ে ফেলে, তাই ঠান্ডার প্রারম্ভেই হিউমিডিফাইয়ার ব্যবহার করা ভালো।’

৬. সাইনাস প্রেসার

যখন আপনি ঠান্ডায় আক্রান্ত হতে যাবেন, তখন আপনি অনুভব করতে পারেন যে আপনার মুখমণ্ডল নিজে নিজে আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে। জলসিক্ত চোখ, ক্লান্ত চোখ, গালে চাপ এবং এমনকি মাথাব্যথা ইঙ্গিত করতে পারে যে, আপনার সাইনাসে ভাইরাস অবস্থান নিয়েছে। এর জন্য ঘরোয়া চিকিৎসা হচ্ছে, চিকেন স্যুপ। কিন্তু এটি কি সত্যিই কাজ করে? ডা. লাউসিয়ার বলেন, ‘আমি মনে করি, চিকেন স্যুপ হাইড্রেশনের জন্য চমৎকার- কারণ এতে আছে গরম তরল, লবণ এবং ইলেক্ট্রোলাইট।’ তিনি যোগ করেন, ‘চিকেন স্যুপের পেঁয়াজ ও রসুনের মধ্যেও আরোগ্য গুণ আছে যা মিউকাসের পুরুত্ব বা ঘনত্ব হ্রাস করে।’ বিজ্ঞান চিকেন স্যুপের অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি বা প্রদাহবিরোধী গুণকে সমর্থন করে। ইউনিভার্সিটি অব নেব্রাস্কার নতুন এক গবেষণায় চিকেন স্যুপের প্রতি শ্বেত রক্তকণিকার (যা ইনফেকশনের বিরুদ্ধে ফাইট করে) রিঅ্যাকশন পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং এতে প্রমাণ হয় যে চিকেন স্যুপের আসলেই ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। ডা. লাউসিয়ার অন্যান্য কোল্ড-ফাইটিং খাবারের কথা বলেছেন, যেমন- রান্না করা হয়নি এমন রসুন, আদা এবং কাঁচা ঝাল মরিচ- এরা হচ্ছে ন্যাচারাল ডিকনজেস্ট্যান্ট বা প্রাকৃতিক কনজেশন দূরকারক।

৭. বুকের কনজেশন

শরীরকে সুস্থ রাখতে পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং পর্যাপ্ত ঘুমের প্রয়োজন আছে। ডা. লাউসিয়ারের মতে, এর পাশাপাশি ইমিউন সিস্টেমকে উন্নত করার জন্য চমৎকার উপায় হচ্ছে অল্প পরিমাণে হালকা ব্যায়াম করা। এটি কোনো আশ্চর্যের বিষয় নয় যে, নিয়মিত ব্যায়াম আপনাকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করবে। সিয়েটলে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের একটি গবেষণায় আবিষ্কার হয়, যেসব নারীরা এক্সারসাইজ বা ব্যায়াম করেছে তাদের ব্যায়াম না করা নারীদের তুলনায় কম ঠান্ডা ছিল। অন্য একটি গবেষণায় পাওয়া যায়, কোল্ড বা ঠান্ডার সময় পরিমিত ব্যায়াম সম্পাদন ঠান্ডার তীব্রতা বা ব্যাপ্তি কমায় না, এটি উপসর্গ হ্রাস করে, তাই গবেষণায় ব্যায়ামে অংশগ্রহণকারীরা ভালো অনুভব করেছে। ইউ.এস. ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের এক ব্যাখ্যামতে, হালকা এক্সারসাইজ বা ব্যায়াম ফুসফুস ও এয়ারওয়ে বা ফুসফুসে বায়ুগমন পথের জীবাণু দূরীকরণে সাহায্য করে। তাই আপনার বুকে টাইটনেস অনুভব করলে ব্যায়াম আপনাকে সাহায্য করতে পারে। হাঁটা ও অন্যান্য হালকা কাজও করুন যা আপনার হার্ট রেটকে প্রতিমিনিটে ১০০ বিটের নিচে রাখবে এবং হাইড্রেটেড থাকুন।

৮. কাশি

যখন বুঝতে পারবেন যে আপনার ঠান্ডা হতে যাচ্ছে, তখন আপনার সম্পূর্ণরূপে বিশ্রামে থাকা উচিত। কিন্তু পরিহাসের বিষয় হচ্ছে, সমতলে পিঠ রেখে শোয়া আপনার জন্য ভালো নয়, কারণ গ্র্যাভিটির কারণে আপনার নাসিকা পথের কনজেশন বা মিউকাস গলায় চলে আসে যা গলায় ক্ষত সৃষ্টি করে এবং কাশির প্রকোপ ঘটায়। সমতলে শুয়ে কাশা স্বস্তিদায়ক নয় এবং এটি আপনাকে জাগ্রত রাখতে পারে। ডা. লাউসিয়ার বলেন, ‘এর পরিবর্তে, গলার পেছনে কফ বা কাশি সৃষ্টিকারী কফ রিসেপটর ইরিটেশন হ্রাস করতে কয়েকটি বালিশের উপর মাথা ঠেকিয়ে শোয়ার চেষ্টা করুন।’ এটি মিউকাস চলাচল এবং শ্বাসগ্রহণ সহজসাধ্য করে।

তথ্যসূত্র : রিডার্স ডাইজেস্ট