কোরআন-হাদিসের আলোকে নারীর পর্দা…

আপডেটঃ ৩:১৭ অপরাহ্ণ | অক্টোবর ২৮, ২০১৫

1445827626

ডেস্ক:
পবিত্র ইসলাম ধর্মে মুসলিম নারীদের পর্দা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মূলত সে কারণেই মুসলিম মা-বোনেরা বাইরে বের হওয়ার সময় এমনকি বাড়িতেও পর্দার মধ্যে থাকেন। মুসলিম নারীর পর্দা সম্পর্কে চলুন পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে জেনে নিই।

১. আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,নারী হলো সতর তথা আবৃত থাকার বস্ত্ত। নিশ্চয়ই সে যখন ঘর থেকে বের হয়, তখন শয়তান তাকে মনোযোগ দিয়ে দেখতে থাকে। আর সে যখন গৃহাভ্যন্তরে অবস্থান করে তখন সে আল্লাহ তাআলার সবচেয়ে বেশি নিকটে থাকে।[আলমুজামুল আওসাত,তবারানি]ব্যাখ্যা : এই হাদিস দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, বিনা প্রয়োজনে নারীর ঘর থেকে বের হওয়া উচিত নয়।কারণ এই হাদিসে বলা হয়েছে, নারী যখন বাহিরে বের হয় তখন শয়তানের কুদৃষ্টিতে পতিত হয় আর সে যখন ঘরে অবস্থান করে তখন আল্লাহ মহানের নিকটবর্তী থাকে।

২. আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ইহরাম গ্রহণকারী নারী যেন নেকাব ও হাতমোজা পরিধান না করে। [সহিহ বুখারি ৪/৬৩, হাদিস : ১৮৩৮] ব্যাখ্যা : কাযী আবু বকর ইবনে আরাবী বলেন, নারীর জন্য বোরকা দ্বারা মুখমন্ডল আবৃত রাখা ফরজ। তবে হজ্বের সময়টুকু এর ব্যতিক্রম। কেননা, এই সময় তারা ওড়নাটা চেহারার উপর ঝুলিয়ে দিবে, চেহারার সাথে মিলিয়ে রাখবে না। পরপুরুষ থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখবে এবং পুরুষরাও তাদের থেকে দূরে থাকবে। [আরিযাতুল আহওয়াযী ৪/৫৬]

৩. আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি অহঙ্কারবশত কাপড় ঝুলিয়ে রাখে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তার দিকে (রহমতের দৃষ্টিতে) তাকাবেন না। তখন উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা (রা.) জিজ্ঞাসা করলেন, তাহলে মহিলারা তাদের কাপড়ের ঝুল কীভাবে রাখবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এক বিঘত ঝুলিয়ে রাখবে। উম্মে সালামা বললেন, এতে তো তাদের পা অনাবৃত থাকবে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে এক হাত ঝুলিয়ে রাখবে, এর বেশি নয়। [সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪১১৭; জামে তিরমিযি ৪/২২৩; সুনানে নাসায়ি ৮/২০৯; মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ১১/৮২] ব্যাখ্যা : ইমাম তিরমিযি বলেন, এই হাদিসে নারীর জন্য কাপড় ঝুলিয়ে রাখার অবকাশ দেওয়া হয়েছে। কারণ এটিই তাদের জন্য অধিক আবৃতকারী।

৪. ওকবা ইবনে আমের জুহানী (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করে, তোমরা নারীদের নিকট যাওয়া থেকে বিরত থাক। এক আনসারী সাহাবী আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! স্বামী পক্ষীয় আত্মীয় সম্পর্কে আপনি কী বলেন? তিনি বললে, সে তো মৃত্যু। [সহিহ বুখারি ৯/২৪২; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২১৭২; জামে তিরমিযি, হাদিস : ১১৭১; মুসনাদে আহমাদ ৪/১৪৯, ১৫৩] ব্যাখ্যা : এই হাদিসে বেগানা নারী-পুরুষের একান্ত অবস্থানকে নিষেধ করা হয়েছে এবং এ প্রসঙ্গে স্বামী পক্ষীয় আত্মীয়-স্বজন যেমন দেবর-ভাসুর ইত্যাদির সাথে অধিক সাবধানতা অবলম্বনকে অপরিহার্য করা হয়েছে।

৫. হযরত আয়েশা (রা.) ইফ্কের দীর্ঘ হাদিসে বলেছেন,আমি আমার স্থানে বসে ছিলাম একসময় আমার চোখ দুটি নিদ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল এবং আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। সফওয়ান ইবনে মুয়াত্তাল আসসুলামী ছিল বাহিনীর পিছনে আগমনকারী। সে যখন আমার অবস্থানস্থলের নিকট পৌছল তখন একজন ঘুমন্ত মানুষের আকৃতি দেখতে পেল। এরপর সে আমার নিকট এলে আমাকে চিনে ফেলল। কারণ পর্দা বিধান অবতীর্ণ হওয়ার আগে সে আমাকে দেখেছিল। সে তখন ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন বলে ওঠে, যার দরুণ আমি ঘুম থেকে জেগে উঠি এবং ওড়না দিয়ে নিজেকে আবৃত করে ফেলি। অন্য রেওয়ায়েতে আছে, আমি ওড়না দিয়ে আমার চেহারা ঢেকে ফেলি।[সহিহ বুখারি ৫/৩২০; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৭৭০; জামে তিরমিযি, হাদিস : ৩১৭৯]

৬. উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা (রা.) বলেন, আমি একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ছিলাম। উম্মুল মুমিনীন মায়মুনা (রা.)ও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এমন সময় আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম উপস্থিত হলেন। এটি ছিল পর্দা বিধানের পরের ঘটনা। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা তার সামনে থেকে সরে যাও। আমরা বললাম, তিনি তো অন্ধ, আমাদেরকে দেখছেন না?! তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরাও কি অন্ধ? তোমরা কি তাকে দেখছ না? [সুনানে আবু দাউদ ৪/৩৬১, হাদিস : ৪১১২; জামে তিরমিযি ৫/১০২, হাদিস : ২৭৭৯; মুসনাদে আহমাদ ৬/২৯৬; শরহুল মুসলিম, নববী ১০/৯৭; ফাতহুল বারী ৯/২৪৮]

৭. উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) বলেন, আমরা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ইহরাম অবস্থায় ছিলাম তখন আমাদের পাশ দিয়ে অনেক কাফেলা অতিক্রম করত। তারা যখন আমাদের সামনাসামনি চলে আসত তখন আমাদের সকলেই চেহারার ওপর ওড়না টেনে দিতাম। তারা চলে গেলে আবার তা সরিয়ে নিতাম।[মুসনাদে আহমাদ ৬/৩০; ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৯৩৫] ব্যাখ্যা : এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, পরপুরুষের সামনে চেহারা ঢেকে রাখা আবশ্যক।

৮. আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) বলেন, আমরা পুরুষদের সামনে মুখমন্ডল আবৃত করে রাখতাম।…[মুসতাদরাকে হাকেম ১/৪৫৪] ব্যাখ্যা : এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সাহাবা-যুগের সাধারণ মহিলারাও গায়র মাহরাম (পরপুরুষ) পুরুষ থেকে নিজেদের চেহারা আবৃত করতেন। কারণ আসমা বিনতে আবি বকর (রা.) এখানে বহুবচন ব্যবহার করেছেন। যা প্রমাণ করে উম্মুল মুমিনগণ ছাড়া অন্য নারীরাও তাদের মুখমন্ডল আবৃত রাখতেন।

৯. ফাতিমা বিনতে মুনযির (রহ.) বলেন, আমরা আসমা বিনতে আবু বকর (রা.)-এর সাথে ইহরাম অবস্থায় থাকাকালে আমাদের মুখমন্ডল ঢেকে রাখতাম।[মুয়াত্তা, ইমাম মালেক ১/৩২৮; মুসতাদরাকে হাকেম ১/৪৫৪]

১০. হযরত ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যখনই কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে একান্তে সাক্ষাত করে তখন তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।[জামে তিরমিযি] ব্যাখ্যা : সুতরাং যতটা সম্ভব নারীদের একান্ত সাক্ষাত এড়িয়ে চলা।

১১. উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) বলেন, একজন মহিলা পর্দার পিছন থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে একটি কাগজ দিতে চাইল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাত গুটিয়ে নিলেন (কাগজটি নিলেন না এবং) বললেন, আমি জানি না, এটা কি পুরুষের হাত না নারীর। মহিলা আরজ করলেন, ‘নারীর হাত।’ নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তুমি যদি নারী হতে তাহলে নিশ্চয়ই নখে মেহেদী থাকত।’ [সুনানে আবু দাউদ, সুনানে নাসায়ী] ব্যাখ্যা : এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, পীর-মুর্শিদ ও উস্তাদের সাথেও পর্দা করা অপরিহার্য এই হাদিসের দ্বারা নারীদের নখে মেহেদী ব্যবহার করার ব্যপারে রাসুল [সা.]-এর অনুমতিগত প্রমাণ পাওয়া যায়।

১২. হযরত উমাইমা বিনতে রুকাইকা (রা.) থেকে বাইয়াত সংক্রান্ত একটি দীর্ঘ হাদিসে আছে যে, নারীগণ বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদের প্রতি আমাদের নিজেদের চেয়েও মেহেরবান। সুতরাং আপনার হাত মোবারক দিন, আমরা বাইয়াত হই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি নারীদের সাথে হাত মিলাই না। (যা মুখে বলেছি তা মেনে চলাই তোমাদের জন্য অপরিহার্য)। [মুয়াত্তা মালিক]

১৩. উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) বলেন, আল্লাহর কসম! বাইয়াতের সময় তাঁর (নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর) হাত কখনো কোনো নারীর হাত স্পর্শ করেনি। তিনি শুধু মুখে বলতেন, তোমাকে বাইয়াত করলাম। [সহিহ বুখারি ২/১০৭১] ব্যাখ্যা : সুতরাং পর্দার বিধানের খেলাফ করে কোনো নারীকে মুরিদ করা ইসলামি বিধান পরিপন্থী।

১৪. হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-দুই শ্রেণীর দোজখি এখনও আমি দেখিনি। (কারণ তারা এখন নেই, ভবিষ্যতে আত্মপ্রকাশ করবে) এক শ্রেণী হচ্ছে ঐ সকল মানুষ, যাদের হাতে ষাঁড়ের লেজের মতো চাবুক থাকবে, যা দিয়ে তারা মানুষকে প্রহার করবে। (দ্বিতীয় শ্রেণী হচ্ছে) ঐ সকল নারী, যারা হবে পোশাক পরিহিতা, নগ্ন, আকৃষ্ট ও আকৃষ্টকারী; তাদের মাথা হবে উটের হেলানো কুঁজের ন্যায়। এরা জান্নাতে যাবে না এবং জান্নাতের খুশবুও পাবে না অথচ জান্নাতের খুশবু তো এত এত দূর থেকে পাওয়া যাবে। [মুসলিম ২/২০৫, হাদিস : ২১২৮]

ব্যাখ্যা : এই হাদিসে বেপর্দা নারীদের প্রতি কঠিন হুঁশিয়ারি শোনানো হয়েছে। সুতরাং তাদের মৃত্যুর আগেই তাওবা করে পর্দার বিধানের দিকে ফিরে আসা কর্তব্য। উপরের হাদিসের আলোচনা থেকে জানা গেল যে, হাদিস শরিফে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্দার বিধান দেওয়া হয়েছে। এই বিধান মেনে চলা সকল ঈমানদার নারী-পুরুষের জন্য অপরিহার্য। এবার ঐ সকল নিকটাত্মীয়দের কথা উল্লেখ করছি, যাদের মাঝে পর্দার হুকুম নেই। এরা ছাড়া অন্য সকলের সাথেই পর্দা করতে হবে।