অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক রাজস্ব ঘাটতি ৬ হাজার কোটি টাকা

আপডেটঃ ২:৩৮ অপরাহ্ণ | অক্টোবর ২৮, ২০১৫

ডেস্ক:

চলতি (২০১৫-১৬) অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নে বড় অঙ্কের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ লক্ষ্য অর্জনের পথে শুরুতেই কিছুটা হোঁচট খেয়েছে সংস্থাটি। অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এনবিআরের রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। এ ঘাটতি পূরণে রাজস্ব ফাঁকি বন্ধের ওপর জোর দিচ্ছে সংস্থাটি। সে লক্ষ্য নিয়েই জোরেশোরে মাঠে নামার পরিকল্পনা করছে তারা।

চলতি অর্থবছরের জন্য ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এ ব্যয় নির্বাহে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংস্থানের লক্ষ্য প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু এনবিআরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ১ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা; গত অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় যা প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে আয়কর থেকে আসার কথা ৬৫ হাজার ৯৩২ কোটি, ভ্যাট থেকে ৬৩ হাজার ৯০২ কোটি ও শুল্ক থেকে ৪৬ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা।

অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এনবিআরের রাজস্ব আহরণের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ সময়ে সংস্থাটি আহরণ করেছে ৩০ হাজার ৯১০ কোটি টাকা। জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ছিল ৩৬ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা। এ হিসাবে প্রথম প্রান্তিকে ঘাটতির পরিমাণ ৫ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা। এছাড়া পুরো অর্থবছরে রাজস্ব আহরণে ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হলেও প্রথম প্রান্তিকে অর্জন হয়েছে ৯ দশমিক ৫১ শতাংশ।

অর্থবছরের প্রথম দিকে ঘাটতি থাকলেও শেষ দিকে এসে তা পূরণ হয়ে যাবে বলে মনে করছে এনবিআর। জানতে চাইলে সংস্থাটির চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, অর্থবছরের প্রথম দিকে রাজস্বে কিছুটা ঘাটতি আছে। তবে শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, আগামী ডিসেম্বরে রাজস্ব পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হবে। তখন প্রকৃত অবস্থা বোঝা যাবে। তাছাড়া আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় দুই মাস বাড়িয়ে ৩০ নভেম্বর করা হয়েছে। এ সময়ে বেশকিছু রাজস্ব জমা হবে। ফলে ধীরে ধীরে ঘাটতি কমে আসবে। আর ঘাটতি মোকাবেলায় তিনজন সদস্য সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। এ উদ্যোগ ভালো ফল দেবে।

প্রথম প্রান্তিকে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক— সব খাতেই রাজস্ব আহরণে ঘাটতি রয়েছে। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে আয়কর থেকে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ছিল ১১ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আহরণ হয়েছে ৯ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ খাতে ঘাটতি রয়েছে ২ হাজার ২৬ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৮০ শতাংশ।

ভ্যাট থেকে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে আহরণের লক্ষ্য ছিল ১৩ হাজার ৯১৬ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আহরণ হয়েছে ১১ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা। এ হিসাবে ভ্যাট থেকে রাজস্ব আহরণে ঘাটতি রয়েছে ২ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক থেকে এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ।

আমদানি শুল্ক বাবদ জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ১১ হাজার ২১৫ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল এনবিআর। এর বিপরীতে সংগৃহীত হয়েছে ৯ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ খাত থেকে অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা। তবে গত অর্থবছরের তুলনায় খাতটিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ।

২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে এনবিআরের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরা হয় ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। কিন্তু অর্জন না হওয়ার শঙ্কায় গত এপ্রিলে তা সংশোধন করে ১ লাখ ৩৫ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা করা হয়। ফলে অর্থবছরটিতে খরচের লাগামও টেনে ধরতে হয় সরকারকে। আড়াই লাখ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা ২ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় নেমে আসে। চলতি অর্থবছরও রাজস্ব ঘাটতি পূরণ না হলে শেষ পর্যন্ত সংশোধনের দিকে এগোতে হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, গত অর্থবছর উচ্চাভিলাষী প্রবৃদ্ধি ধরে রাজস্ব প্রাক্কলন করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা অর্জন হয়নি। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর জন্য চলতি অর্থবছরও বড় প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে। তবে রাতারাতি এ অনুপাত বাড়ানো সম্ভব নয়। ফলে চলতি অর্থবছরও রাজস্ব লক্ষ্য সংশোধন করার প্রয়োজন হতে পারে।

তিনি বলেন, রাজস্ব বাড়ানোর জন্য এনবিআর কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু সেগুলো যথেষ্ট নয়। রাজস্ব বাড়াতে হলে করের আওতা উপজেলা পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে।

গত অর্থবছর সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রায় শুল্ক আহরণের লক্ষ্য ছিল ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এছাড়া ভ্যাট থেকে আহরণের লক্ষ্য ছিল ৪৮ হাজার ২৬৪ কোটি ও আয়কর থেকে ৪৯ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল। তবে অর্থবছরের শুরুতে রাজস্বের যে লক্ষ্য ধরা হয়েছিল, তা থেকে বেশ দূরেই ছিল প্রকৃত আহরণ।